টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। সিলেট নগরী ও সুনামগঞ্জ জেলা শহরসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকা এখন পানির নিচে। মঙ্গলবার জেলার সুরমা, কুশিয়ারা, সারি ও সারি-গোয়াইন নদীর ছয়টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ২০ দিনের মাথায় দ্বিতীয় দফা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে সিলেট। মহানগর ও জেলাজুড়ে প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে মহানগরে ১৫টি এলাকার ১০ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত। বন্যার ঝুঁকিতে পড়েছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি এলাকার বিদ্যুতের সাবস্টেশন। সুরমা নদী ছাপিয়ে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এটি প্লাবিত হলে দক্ষিণ সুরমার প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়তে পারে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বন্যাকবলিত অসংখ্য মানুষ এবার ঈদ উদযাপন করতে পারেনি। তাদের জন্য আমরা সমবেদনা জানাচ্ছি।
এদিকে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার ও তিস্তা নদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানিতে নদনদী তীরবর্তী চর, দ্বীপচর ও নিম্নাঞ্চলগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। এতে বন্যার আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ধরলা নদীর পানি বেড়ে তালুক শিমুলবাড়ী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার, কাউনিয়া পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার এবং পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমর নদের পানি ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে, ২০২২ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ওই বন্যায় দুই জেলায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আমাদের দেশে প্রায় প্রতি বছরই সিলেট এবং কুড়িগ্রামে বন্যা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট অঞ্চলে ঘন ঘন বন্যার কারণ আসলে দুই ধরনের। প্রথমটি প্রাকৃতিক ও দ্বিতীয়টি কৃত্রিম। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ যেমন দায়ী তেমনি আমাদের ভূমিকাও নেহায়েত কম নয়। ভারতের মেঘালয়ে অতি বৃষ্টি থেকে যে পানি আসে, সেটি বেশিরভাগই সুরমা ও কুশিয়ারা বয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে বেশি পরিমাণ পানি প্রবাহের সক্ষমতা আমাদের নদীগুলোর নেই। এর মূল কারণ নদীর নাব্য সংকট। এ ছাড়া কৃত্রিম কারণের মধ্যে রয়েছে—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা। এর ফলে সম্প্রতি সিলেট অঞ্চল ঘন ঘন বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। তবে সুষ্ঠু নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। বন্যা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে যে কোনো শহরের পাশে মৌসুমি প্লাবন ভূমি রাখা খুব জরুরি। অথচ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে প্রাকৃতিক প্লাবন ভূমিতে বসতি স্থাপন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ করা হয়েছে। শহরগুলোতে পুকুর ভরাট করে ফেলা ও খোলা জায়গার অভাবের কারণে বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধারণের পথ বন্ধ হয়েছে। এ পরিস্থিতি উন্নতির জন্য টেকসই বন্যা প্রতিরোধী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
এবার অবশ্য সিলেটের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেছেন, দেশের কয়েক জায়গায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ডায়রিয়া এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধ মুজত রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে, বন্যার সময় এবং বন্যা-পরবর্তী রোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন তিনি।
সিলেট বিভাগে ২০২২ সালের বন্যায় যে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছিল, এতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, তা হলো—বন্যা মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুনাম থাকার পরও, সিলেটের মতো বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য আমাদের প্রস্তুতি ছিল যথেষ্ট দুর্বল। এবার যাতে তেমনটি না হয় সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
ডিপি ডেস্ক 
















