ঢাকা ০৫:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজারে আম : বাংলাদেশের সম্ভাবনার সুবাস

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো সাতক্ষীরা ও যশোরের আম দিয়ে। গত বুধবার চীনে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ টন আম রপ্তানির মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত হলো। এ রপ্তানি শুধু একটি ফলের নয়, বরং বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সক্ষমতার প্রতীক। এর মাধ্যমে প্রমাণ হলো- যথাযথ মান বজায় রেখে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে কৃষিপণ্যও হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় উৎস।

চীনের মতো বিশাল ভোক্তা বাজারে প্রবেশ সহজ ছিল না। দীর্ঘ ছয় বছরের আলোচনা, আন্তর্জাতিক মানদ- পূরণ এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ফসল এই সাফল্য। শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নয়, বরং বিদেশি ভোক্তাদের জন্যও বাংলাদেশের আম আজ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে যেমন ওঠে এসেছে, এই রপ্তানি দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিক খুলে দেবে, তেমনি বাংলাদেশের কৃষি খাতকেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ধারায় নিয়ে আসবে। তবে এ সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে কৃষকদের শ্রম, তেমনি রয়েছে সরকারি নীতি-সহায়তা ও গবেষণার অবদান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, গাছের পরিচর্যা, ব্যাগিং, প্যাকেজিং প্রভৃতিতে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে মানসম্পন্ন আম উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। আবার কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবনী জাত ও প্রযুক্তির প্রয়োগও উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রপ্তানির এই সাফল্য যতটা গৌরবজনক, ততটাই চ্যালেঞ্জপূর্ণও। প্রধান বাধা হিসেবে বিমান ভাড়া বেশি হওয়াকে চিহ্নিত করেছেন কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য পরিবহন ব্যয় কমানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন। আম রপ্তানির এই সাফল্যের পরও একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়- দেশের অভ্যন্তরে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কিনা? আম রপ্তানির সুফল যাতে কেবল রপ্তানিকারক বা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে না যায়, সেজন্য একটি স্বচ্ছ এবং কৃষককেন্দ্রিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে আম বিক্রি হয়, তার ছিটেফোঁটাও চাষির হাতে আসে না। তাই উৎপাদক থেকে শুরু করে রপ্তানিকারক পর্যন্ত একটি ন্যায্য ও অংশীদারত্বমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে কৃষক তার শ্রমের যথোচিত মূল্য পায়। বাংলাদেশ বিশ্বে আম উৎপাদনে সপ্তম হলেও এতদিন রপ্তানির তালিকায় ছিল অনেক পিছিয়ে। এবার শুধু চীনই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে আম রপ্তানি শুরু হওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে- বাংলাদেশি আমের আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ছে। রাজশাহীর চার জেলার কৃষকরা এবার ৬৭ কোটি টাকার আম রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি অর্থনৈতিক ইতিবাচক বার্তা।

এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা- উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি চেইনে প্রতিটি স্তরে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পেয়ারা, কাঁঠালসহ অন্য কৃষিপণ্যের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। এইভাবে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য কেবল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে উঠবে। বিশ্ববাজারে ‘বাংলাদেশি আম’ একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠুক- এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ববাজারে আম : বাংলাদেশের সম্ভাবনার সুবাস

আপডেট সময় ০৩:৩০:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ মে ২০২৫

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো সাতক্ষীরা ও যশোরের আম দিয়ে। গত বুধবার চীনে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ টন আম রপ্তানির মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত হলো। এ রপ্তানি শুধু একটি ফলের নয়, বরং বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সক্ষমতার প্রতীক। এর মাধ্যমে প্রমাণ হলো- যথাযথ মান বজায় রেখে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে কৃষিপণ্যও হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় উৎস।

চীনের মতো বিশাল ভোক্তা বাজারে প্রবেশ সহজ ছিল না। দীর্ঘ ছয় বছরের আলোচনা, আন্তর্জাতিক মানদ- পূরণ এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ফসল এই সাফল্য। শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নয়, বরং বিদেশি ভোক্তাদের জন্যও বাংলাদেশের আম আজ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে যেমন ওঠে এসেছে, এই রপ্তানি দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিক খুলে দেবে, তেমনি বাংলাদেশের কৃষি খাতকেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ধারায় নিয়ে আসবে। তবে এ সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে কৃষকদের শ্রম, তেমনি রয়েছে সরকারি নীতি-সহায়তা ও গবেষণার অবদান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, গাছের পরিচর্যা, ব্যাগিং, প্যাকেজিং প্রভৃতিতে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে মানসম্পন্ন আম উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। আবার কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবনী জাত ও প্রযুক্তির প্রয়োগও উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রপ্তানির এই সাফল্য যতটা গৌরবজনক, ততটাই চ্যালেঞ্জপূর্ণও। প্রধান বাধা হিসেবে বিমান ভাড়া বেশি হওয়াকে চিহ্নিত করেছেন কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য পরিবহন ব্যয় কমানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন। আম রপ্তানির এই সাফল্যের পরও একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়- দেশের অভ্যন্তরে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কিনা? আম রপ্তানির সুফল যাতে কেবল রপ্তানিকারক বা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে না যায়, সেজন্য একটি স্বচ্ছ এবং কৃষককেন্দ্রিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে আম বিক্রি হয়, তার ছিটেফোঁটাও চাষির হাতে আসে না। তাই উৎপাদক থেকে শুরু করে রপ্তানিকারক পর্যন্ত একটি ন্যায্য ও অংশীদারত্বমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে কৃষক তার শ্রমের যথোচিত মূল্য পায়। বাংলাদেশ বিশ্বে আম উৎপাদনে সপ্তম হলেও এতদিন রপ্তানির তালিকায় ছিল অনেক পিছিয়ে। এবার শুধু চীনই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে আম রপ্তানি শুরু হওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে- বাংলাদেশি আমের আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ছে। রাজশাহীর চার জেলার কৃষকরা এবার ৬৭ কোটি টাকার আম রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে একটি অর্থনৈতিক ইতিবাচক বার্তা।

এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা- উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি চেইনে প্রতিটি স্তরে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পেয়ারা, কাঁঠালসহ অন্য কৃষিপণ্যের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। এইভাবে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য কেবল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে উঠবে। বিশ্ববাজারে ‘বাংলাদেশি আম’ একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠুক- এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।