ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
টপ নিউজ :

আর বিভাজন নয়

সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত এবারের ছাত্র আন্দোলনের দুটি বৈশিষ্ট্য– সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা এবং দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া। আবার যেহেতু কোনো রাজনৈতিক মত ও পথের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। এ কারণে খানিক অগোছালো, নেতৃত্বহীনতা এবং সমন্বয়ের অভাব ছিল।

এ কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একাধিক সুযোগসন্ধানী গ্রুপ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। ফলে ১৬ থেকে ২১ জুলাই এ দেশে নজিরবিহীন সহিংসতায় জ্বালাও- পোড়াও, রাষ্ট্রীয় সম্পদ স্থাপনায় ভাঙচুর ছাড়াও দেড় শতাধিক মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য ছাত্র-শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের দায় যতটা, এর চেয়ে হাজার গুণ দায় বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী ঘাপটি মেরে থাকা রাজনৈতিক অপশক্তি এবং সমানভাবে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের। 

কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থী ছাড়াও পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, এমনকি ঘরে থাকা শিশুর করুণ মৃত্যু আমাদের বিচলিত করেছে। এক শিক্ষার্থী যখন রাজপথে পুলিশি হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে, তখন তা অসম বয়সী বা প্রাপ্তবয়সী শিক্ষার্থীকে ভারাক্রান্ত করছে দারুণ আবেগে। সেই আবেগে সারাদেশের স্কুল শিক্ষার্থীরাও ঘর ছেড়েছে। তখন অনেক অভিভাবকই কোনো রাজনৈতিক মত-পথের পথিক না হয়েও প্রিয় সন্তানের পিছু নিয়েছিলেন। এভাবেই রাজপথে এক সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য যেমন বড় ভাই ছুটেছেন, একইভাবে কারও ক্ষেত্রে মা-বাবাও পাগলের মতো ছুটে বেরিয়েছেন। ফলে রাজপথে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে।

আবার শিক্ষার্থীদের বারুদের মতো স্পর্শকাতর ‘ছাত্র আন্দোলন’ রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীদের দ্বারা ছিনতাই হওয়াও অভূতপূর্ব কিছু নয়। কিন্তু তাদের দমনে কত কারফিউ জারি হবে কিংবা কতদিন সেনাবাহিনী থাকবে রাজপথে? মৃত্যুর মিছিলে দেড়শ দু’শ এভাবে গুনতে গিয়ে জনমনে বাড়বে রাগ ও ক্ষোভ। তাই সরকারের পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও কিছু উপলব্ধি হওয়া জরুরি। 

নিজ রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরের বিপুলসংখ্যক মানুষকে সামাল দেওয়ার জন্য ভিন্নমত ও মতাদর্শকে দমন নয় সুযোগ দিন; তাদের কথা শুনুন।

মানুষের জীবনমান তথা বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, সর্বোপরি সুষম খাদ্য ঘাটতি বজায় রেখে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরাবরের মতো একাত্তর, স্বাধীনতা, একাত্তরের পরাজিত ও পক্ষের শক্তি এসব স্লোগানে মানুষের মন এখন আর ভিজবে না। পেটে ক্ষুধা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা– এসব বোধে মানুষের মন উজ্জীবিত হয় না। আর নয় কোনো বিভাজন। সর্বোচ্চ আদালত মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫ শতাংশ রেখে কোটা সমস্যার আইনগত সমাধান দিয়েছেন। আসুন, কৃষক, শ্রমজীবী, স্বল্প আয়ের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করি। কান পেতে শুনি মানুষের ন্যূনতম চাওয়া-পাওয়া। তবেই আম জনতা উন্নয়নের পরম পথে নিজেকে একাত্ম করবে; নিজেরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আর ভাঙচুর করবে না। বরং নিজেদের প্রাণ দিয়েই তা রক্ষা করবে। আসুন, দেশ গড়ায় ধনবৈষম্যের শিকার দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে পাশে নিয়ে চলি; চাটুকার আর সুযোগসন্ধানীদের ত্যাগ করি। মনে রাখতে হবে, ১৫ জুলাই ২০২৪-এর আগের বাংলাদেশ আর ফিরবে না। 

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা: সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক 

জনপ্রিয় সংবাদ

এয়ারবাস থেকে ১০ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, ক্রয়চুক্তি সই

আর বিভাজন নয়

আপডেট সময় ০৬:১৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অগাস্ট ২০২৪

সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত এবারের ছাত্র আন্দোলনের দুটি বৈশিষ্ট্য– সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা এবং দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া। আবার যেহেতু কোনো রাজনৈতিক মত ও পথের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। এ কারণে খানিক অগোছালো, নেতৃত্বহীনতা এবং সমন্বয়ের অভাব ছিল।

এ কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একাধিক সুযোগসন্ধানী গ্রুপ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। ফলে ১৬ থেকে ২১ জুলাই এ দেশে নজিরবিহীন সহিংসতায় জ্বালাও- পোড়াও, রাষ্ট্রীয় সম্পদ স্থাপনায় ভাঙচুর ছাড়াও দেড় শতাধিক মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য ছাত্র-শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের দায় যতটা, এর চেয়ে হাজার গুণ দায় বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী ঘাপটি মেরে থাকা রাজনৈতিক অপশক্তি এবং সমানভাবে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের। 

কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থী ছাড়াও পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, এমনকি ঘরে থাকা শিশুর করুণ মৃত্যু আমাদের বিচলিত করেছে। এক শিক্ষার্থী যখন রাজপথে পুলিশি হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে, তখন তা অসম বয়সী বা প্রাপ্তবয়সী শিক্ষার্থীকে ভারাক্রান্ত করছে দারুণ আবেগে। সেই আবেগে সারাদেশের স্কুল শিক্ষার্থীরাও ঘর ছেড়েছে। তখন অনেক অভিভাবকই কোনো রাজনৈতিক মত-পথের পথিক না হয়েও প্রিয় সন্তানের পিছু নিয়েছিলেন। এভাবেই রাজপথে এক সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য যেমন বড় ভাই ছুটেছেন, একইভাবে কারও ক্ষেত্রে মা-বাবাও পাগলের মতো ছুটে বেরিয়েছেন। ফলে রাজপথে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে।

আবার শিক্ষার্থীদের বারুদের মতো স্পর্শকাতর ‘ছাত্র আন্দোলন’ রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীদের দ্বারা ছিনতাই হওয়াও অভূতপূর্ব কিছু নয়। কিন্তু তাদের দমনে কত কারফিউ জারি হবে কিংবা কতদিন সেনাবাহিনী থাকবে রাজপথে? মৃত্যুর মিছিলে দেড়শ দু’শ এভাবে গুনতে গিয়ে জনমনে বাড়বে রাগ ও ক্ষোভ। তাই সরকারের পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও কিছু উপলব্ধি হওয়া জরুরি। 

নিজ রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরের বিপুলসংখ্যক মানুষকে সামাল দেওয়ার জন্য ভিন্নমত ও মতাদর্শকে দমন নয় সুযোগ দিন; তাদের কথা শুনুন।

মানুষের জীবনমান তথা বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, সর্বোপরি সুষম খাদ্য ঘাটতি বজায় রেখে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরাবরের মতো একাত্তর, স্বাধীনতা, একাত্তরের পরাজিত ও পক্ষের শক্তি এসব স্লোগানে মানুষের মন এখন আর ভিজবে না। পেটে ক্ষুধা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা– এসব বোধে মানুষের মন উজ্জীবিত হয় না। আর নয় কোনো বিভাজন। সর্বোচ্চ আদালত মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫ শতাংশ রেখে কোটা সমস্যার আইনগত সমাধান দিয়েছেন। আসুন, কৃষক, শ্রমজীবী, স্বল্প আয়ের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করি। কান পেতে শুনি মানুষের ন্যূনতম চাওয়া-পাওয়া। তবেই আম জনতা উন্নয়নের পরম পথে নিজেকে একাত্ম করবে; নিজেরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আর ভাঙচুর করবে না। বরং নিজেদের প্রাণ দিয়েই তা রক্ষা করবে। আসুন, দেশ গড়ায় ধনবৈষম্যের শিকার দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে পাশে নিয়ে চলি; চাটুকার আর সুযোগসন্ধানীদের ত্যাগ করি। মনে রাখতে হবে, ১৫ জুলাই ২০২৪-এর আগের বাংলাদেশ আর ফিরবে না। 

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা: সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক