পবিত্র নগরী মক্কায় অবস্থিত আল্লাহর ঘর-কাবা শরিফ। জমজমের পানি পৃথিবী জুড়ে মুসলিমদের কাছে সুপরিচিত হলেও, কাবাকে ঘিরে রয়েছে আরেকটি বিশেষ পানির উৎস, যা অনেকের অজানা। এ পানি আসে কাবাঘরের ছাদ থেকে যা উৎস বৃষ্টি। আর মুসলিমরা একে পবিত্র বলে মনে করেন।
কাবাঘরের ছাদের আয়তন ১,৩০৬ বর্গফুট। এর উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি বিশেষ নকশা রয়েছে, যেটি ‘মিজাবুর রহমান’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ ‘আল্লাহর রহমতের নল’। শত বছর ধরে সোনালি নকশাদার এই পাইপ কাবার ছাদে জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিচে নামিয়ে আনছে। মরুময় মক্কায় ঝড়-বৃষ্টি যদিও বিরল, তবু যখনই নামে, মুসল্লিরা এই পানিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে গ্রহণ করেন।
ইতিহাসবিদরা জানান, হাজিরা ও ওমরাহতে অংশ নিতে আসা বহু মুসল্লি বৃষ্টির সময় মিজাব থেকে পড়া পানিতে শরীর ভিজিয়ে নেন। কেউ কেউ এটিকে ‘কাবার দ্বিতীয় পবিত্র পানি’ বলেও উল্লেখ করেন। প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, মিজাবের নিচে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে মানুষ নবজাতকের মতো পবিত্র হয়ে যায়।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-আজরাকি তার কিতাব আকবর-ই মক্কা গ্রন্থে এবং ভ্রমণকারী ইবনে জুবায়ের (১১৮৩-৮৫ খ্রি.)-এর বর্ণনায়ও এ পানির আধ্যাত্মিক গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে। যদিও কোনো সহিহ হাদিসে এ পানির বিশেষ গুণাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, তবুও যুগে যুগে মুসলিমরা একে বরকতময় বলে মান্য করেছেন।
প্রথমবার কাবার ছাদে নালা বসানো হয় খলিফা হারুনুর রশীদের আমলে (অষ্টম শতাব্দী)। তবে কাঠ ও সাধারণ ধাতুর তৈরি সেই নালা টেকসই ছিল না। পরে বহুবার পরিবর্তিত হয়ে আজকের স্বর্ণখচিত রূপে দাঁড়িয়েছে।
১৬২৬ সালের ভয়াবহ বন্যায় কাবার কয়েকটি দেয়াল ধসে পড়লে, পরের বছর অটোমান সুলতান মুরাদ কাবাকে নতুন করে নির্মাণ ও মজবুত করেন। তখন সোনালি মিজাব সংযোজন করা হয়, যা আজও রয়েছে। এরপর সৌদি বাদশাহরা এর সংস্কার করে আধুনিক প্রযুক্তির ছাদে ঐতিহ্যবাহী এই নালা বজায় রেখেছেন।
জমজমের পানি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হলেও মিজাবুর রহমান থেকে পড়া পানি সবার নাগালে আসে না। এটি শুধু বৃষ্টির সময় ঝরে পড়ে। নিরাপত্তা ও ভিড়ের কারণে অনেকে তা সরাসরি দেখতে বা ছুঁতে পারেন না। ফলে মুসলিম বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠী এ পানির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। তবে যারা এ পানিতে শরীর ভিজানোর সুযোগ পেয়েছেন, তারা এটিকে আল্লাহর বিশেষ রহমত বলে বিশ্বাস করেন। অনেকে মনে করেন, এ পানি শরীর ও আত্মাকে পবিত্র করে।
প্রায় ৪০০ বছর আগে যেমন বৃষ্টির পানি মিজাব দিয়ে ঝরে পড়ত, আজও ঠিক তেমনই ঝরে পড়ে। আধুনিক প্রযুক্তিতে কাবার ছাদ সংস্কার হলেও এই প্রাচীন নালা তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, আর মুসলিমদের কাছে পবিত্র পানির আরেকটি বিশেষ প্রতীক হয়ে আছে।
নিজস্ব সংবাদ : 
















