নিজ সংবাদ ॥ অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মিজ্ ফরিদা আখতার নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে আগষ্টের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদদের আত্মার প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা ও আহত ছাত্র-জনতার প্রতি সমবেদনা ও সম্মান জানিয়ে বলেছেন- আজ থেকে ১৩৪বছর আগে মরমি সাধক ফকির লালন সাঁই তৎকালিন জোদ্দার জমিদারদের বিরুদ্ধে গরীবদের উপর যে জুলুম অত্যার করে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। তৎকালিন তাঁর বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন প্রাসঙ্গিক এবং সর্বজন গ্রহনযোগ্য ছিল। ঠিক তেমনি আজকের স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারকে পতন ঘটাতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনও তেমনি প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ন। তরুন ছাত্র-জনতার প্রতি আমার এবং সরকারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ পরিবার এবং আহতদের পরিবারের সকল দায়িত্ব সরকার বহন করতে বদ্ধপরিকর। মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈষম্য বিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠার রূপকার ছিলেন লালন সাঁই। সবকিছুর উর্ধে মানুষ ও মানবতা। জাত-পাতের কোন মূল্য নেই, মূল্য শুধু মানবতার। তাই সবার আগে নিজেদের মধ্যে হানাহানী বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে থেকে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হতে হবে। বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের কোন ধর্ম ও জাত ছিলনা। লালনের একটি মাত্র পরিচয় ছিল সেটি হচ্ছে মানবতা। তিনিই একমাত্র বাউল সাধক যিনি সকল ধর্মের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে সদা সত্য পথে চলতে মানুষকে মানবতাবাদীর পথে ডাক দিয়ে ছিলেন। তাই আমাদের লালন সাঁইয়ের আর্দশ হোক আধুনিক সমাজ গড়ার পথ ও পাথেয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়ীতে লালন একাডেমির আয়োজনে বাউল সম্রাটের ১৩৪তম তিরোধান দিবসের ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মিজ্ ফরিদা আখতার এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্র কিংবা সমাজের বৈষম্য নয়, সবার আগে নিজের মধ্যকার বৈষম্য দুর করতে হবে। তবেই তো একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। দেশের উন্নয়নের অগ্রে নারী সমাজের অবদান রয়েছে অপরিসীম। তাদের প্রতি, তাদের কাজের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। লালন সাঁইজি অহিংস মানবতার ব্রত নিয়ে মানুষের কল্যাণে অসংখ্য গান সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁর এই অমর সৃষ্টি সঙ্গীত কোন ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সকল ধর্মের উর্ধে থেকে সম্প্রীতির বাধনে আবদ্ধ করতে মরমী এই সাধক মানব মুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। প্রধান অতিথি মিজ্ ফরিদা আখতার বক্তাদের দাবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, লালন একাডেমির মঞ্চ স্থায়ী করার জন্য আমি সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়ে বলবো, যাতে দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী মঞ্চ তৈরী করার ব্যবস্থা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই আগত অতিথি ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া, ক্রেষ্ট ও আত্মসুদ্ধির প্রতীক একতারা উপহার দিয়ে বরণ করে নেন।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মোছা: শারমিন আখতারের সভাপতিত্বে গেষ্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, কুষ্টিয়া সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ রুহুল আমিন, কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালি) আসনের সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার আহবায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি আল মামুন সাগর, ছাত্র-জনতা প্রতিনিধি আলমাস হাসান মামুন ও এস এম সুইট প্রমুখ। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন লালন মাজারের প্রধান খাদেম মহম্মদ আলী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুমারখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম।
আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে লালন মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয় লালন সংগীতি। এতে উদ্বোধনী প্রার্থনা সংগীত পরিবেশন করেন পরম শ্রদ্ধেয় গুরু নহির শাহ ও তার ভেগধারী বাউল ফকিরগণ। বাউল ও লালন একাডেমির শিল্পীরা সেখানে মধ্যরাত পর্যন্ত লালনের গান পরিবেশন করেন। কালী নদীর তীরে বিশাল মাঠে শতাধিক অস্থায়ী দোকান বসেছে। গান শোনার ফাঁকে সেখানে মানুষ কেনাকাটা করছেন।
প্রবেশপথ, আখড়াবাড়ি (বারামখানা) ও মেলার মাঠ চত্বর কোথাও যেন তিল পরিমাণ জায়াগা ফাঁকা নেই। লালন সাধু-ভক্তদের পদচারণায় মিলন মেলায় পরিনিত হয়েছে। সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার প্রাঙ্গনে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
গুরু শিষ্যের ভাব বিনিময় ও অধিবাসের মধ্যদিয়ে শুরু হয় ফকির লালন শাহের ১৩৪ তম তিরোধান দিবসের সাধুসঙ্গ। আজ শুক্রবার সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্যদিয়ে এ সাধুসঙ্গ শেষ হবে বলে জানান বয়োজ্যেষ্ঠ হৃদয় সাধু। তাঁর ভাষ্য, লালন শাহের প্রতি প্রেম-ভালবাসার টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ ছুটে এসেছেন। তাঁদের পদচারণায় মুখরিত আখবাড়ি মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে।
সাধু-ভক্তরা বলছেন, এ বছর উৎসব শুরুর সপ্তাহখানেক আগে থেকে প্রচুর মানুষ আসছে। শুরুর দিনে পা ফেলার জায়গা ফাঁকা নেই। মায়ার টানে, আত্মার টানে সাধু-ভক্তরা ছুটে আসছেন ধামে। আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ বাদ্যযন্ত্র ও গানে গানে মুখর হয়ে উঠছে।
লালন শাহের মাজারের সহকারী খাদেম রিপন শাহ বলেন, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে বাণী লালন সাঁইজি প্রচার করে গেছেন তাঁর জীবদ্দশার তা আজও ফাল্গুন ধারার মত প্রবাহমান।
১৮৯০ সালের ১ কার্তিক লালন সাঁই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকে আখড়াবাড়ি চত্বরে তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা তাঁদের সাঁইজিকে স্মরণ করে আসছেন। লালন একাডেমি প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় একাডেমি চত্বরে লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন কনক চৌধুরী।
নিজস্ব সংবাদ : 










