আরিফ মেহমুদ ॥ বিশিষ্ট কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে আগষ্টের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদদের আত্মার প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা ও আহত ছাত্র-জনতার প্রতি সমবেদনা ও সম্মান জানিয়ে বলেছেন, মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইকে যুগে যুগে বাউল স¤্রাট উল্লেখ করে তাঁর মানবতার কল্যাণের ফকিরিবাদ মতামতকে ক্ষতি করে আসছে। বাউল শব্দটিকে কোন অর্থবহ করে না। বরং ফকিরদের সাথে যুক্ত করে ফকিরিবাদ খাটো করেছে। ফকির লালন সাঁই মানব সেবার ব্রত নিয়ে অসংখ্য গান লিখে গেছেন। তাঁর এই অমর সৃষ্টি সঙ্গীতে কখনই বাউল শব্দ ছিলনা। তাঁর গান কোন ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এদিকে যেমন তাঁর সৃষ্টি ছড়িয়েছে বিশ্বে তেমনি তাঁকে নিয়ে হচ্ছে উন্নতর গবেষনা। মুলত নদীয়ার পাঁচটি ঘরের ধারাকেই লালন ফকিরিবাদের মুল ধারা হিসেবে প্রচলন রেখে গেছেন। সমাজের হানাহানি দূর করে মানুষকে শান্তির পথ দেখিয়েছে লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদ। গতকাল শুক্রবার রাতে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়ীতে লালন একাডেমির আয়োজনে বাউল সম্রাটের ১৩৪ তম তিরোধান দিবসের ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের ২য় দিনে প্রধান অতিথি ও মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ফকির লালনের ভাবধারা যুগে যুগে মেয়ে সঙ্গী এবং নেশায় দ্রব্য দিয়ে বিচ্যুৎ করা হয়েছে। যার আমি তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ভাব সাধকের এই পবিত্র জায়গায় এধরনের প্রচলন চলতে দেয়া যাবে না। যেমনভাবে নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে আগষ্টের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিষ্ট সরকারকে বিদায় করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে আজকের প্রজন্ম সাধনার জায়গায় বদজাতিকে মেনে নিবেন না। তাদেরও বিদায় করবে। মানুষের ধারনা এসব মাজারে নেশা জাতিয় দ্রব্য খাওয়া হয়। তাই আজকে স্বৈরাচারী ফ্যাসিষ্ট সরকারের পতনের পর মাজার ভাঙ্গা হচ্ছে। মাজার ভাঙ্গা ফৌজদারী অপরাধ। প্রশাসনকে বলবো এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিন। লালনের ফকিরি ভাবের সত্য প্রকাশ না হওয়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাজার ভাঙ্গার দায় লালন একাডেমিকে নিতে হবে।
তিনি বলেন, লালনের মুল জায়গায় শুধুই ভাবনগর। লালনের ভক্তরা শুধু মানুষের ভজন করে, নেশার নয়। আমাদের ভুল ধারনা থেকে মুক্ত হতে হবে। এখানে নেশাদ্রব্য নিষিদ্ধ। লালনের চর্চা সঠিক ভাবে করতে নেশা হবে ভাবের, নেশা প্রজ্ঞার, নেশা হবে মানবতা। যা দিয়ে আমরা নিজেদের জয় করতে পারি। লালন সাঁইয়ের ফকিরি মতবাদেও প্রচার ও প্রসার ঘটাতে এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণর প্রতিষ্ঠান “নবপ্রাণ” এবং লালন একাডেমি হতে হাত রেখে এক সাথে চলবে। তিনি সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়ের প্রতি আহবান রেখে বলেন লালন একাডেমি ফকিরদের প্রতিষ্ঠান ফকিরদের হাতেই ছেড়ে দিন।
তিনি বলেন, নদীয়ার প্রথম ফকির হল চৈতন্য। লালন সাঁই চৈতন্যের ভাবধারায় নিজেকে ফকির হিসেবে গড়ে তোলেন। লালনের এই প্রসার কোন ভাবেই ভারত মেনে নেয়নি। যুগে যুগে ভারত পরিকল্পিতভাবে এদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে দেয়নি বর্তমানেও দিচ্ছেনা। দিল্লি ক্রমাগত ভাবে আমাদের নতুন স্বাধিন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই মহাজ্ঞানী মহাত্মা লালনের সৃষ্টির কৃর্তি আজ আর কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীর মধ্যে আবদ্ধ নেই। লালন সাঁই জাত-ধর্মের সিমাবদ্ধতার বাইরে মানুষকে সবার উপর তুলে ধরেছেন। বাংলার ভাবজগৎ বর্তমান বিশে^ অনেকটাই সমৃদ্ধ।
তিনি আজকের প্রজন্মের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, আজকের প্রজন্মকেই নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যেমন এদেশকে গড়ে তুলতে হবে তেমনি বেশি বেশি লালন চর্চা করে কুষ্টিয়াকে ভাবনগর হিসেবে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, তাঁর কর্মসাধনা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বহির্বিশে^ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধুরা এই আখড়াবাড়ীতে এসে সত্য পথে চলার মন্ত্রে দিক্ষা নিয়ে নিজেদের আলোকিত করছেন।
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসের ৩ দিনের অনুষ্ঠানমালার ২য় দিন শুক্রবার রাতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোছা: শারমিন আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, কুষ্টিয়া জজ কোর্টের সাবেক পিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. গোলাম মহম্মদ, ছাত্র-জনতা প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান, তৌকির আহমেদ প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসটি) মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই আগত অতিথি ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া, ক্রেষ্ট ও আত্মসুদ্ধির প্রতীক একতারা উপহার দিয়ে বরণ করে নেন। দ্বিতীয় পর্বের সঙ্গীতানুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত লালন সঙ্গীত শিল্পী উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন লালন একাডেমীর সাবেক সদস্য বাউল আব্দুল কুদ্দুস। সঙ্গীত পরিবেশন করেন সমির বাউল, সুফিয়া কাঙালিনী। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই সংগীত পরিবেশন। তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানের সার্বিক উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেন ফারহানা ইয়াসমিন ও কনক চৌধুরী।
নিজস্ব সংবাদ : 










