ঢাকা ০৪:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
টপ নিউজ :

ম্যানেজ করেই অবাধে ইলিশ শিকার, ‘অসহায়’ মৎস্য বিভাগ

ঢাকা অফিস ॥ দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গত ১৩ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা, বেচা-কেনা ও পরিবহনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার।  আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলছে এ নিষেধাজ্ঞা। তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই পটুয়াখালীর বাউফলে দেশের অন্যতম ইলিশ অভয়াশ্রম কেন্দ্রে তেঁতুলিয়া নদীর ৪০ কিলোমিটার এলাকায় চলছে অবাধে মা ইলিশ নিধনের মহোৎসব। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে কয়েকশ মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো নদী। পুরো নদী জুড়ে ইলিশ নিধনের উৎসব চললেও প্রশাসনের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, ইলিশ রক্ষা অভিযান দলের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই অবাধে ইলিশ নিধন করছেন জেলেরা। ওই অসাধু ব্যক্তিরা বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রশাসনের অভিযানে নামার খবর জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়। এতে জেলেরা সর্তক হয়ে যান। অভিযান শেষে পুনরায় নদীতে জাল নিয়ে নামে তারা। তবে নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যে সব জেলেরা মাছ শিকার করছেন তারা অধিকাংশই মৌসুমি জেলে বলে দাবি করেছেন প্রকৃত জেলেরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তেঁতুলিয়া নদীর চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের বাতির খাল, চরমিয়াজান, চর রায়সাহেব, চর ব্যারেট, কালাইয়া ইউনিয়নের  শৌলা তারের পোল, চরকালাইয়া, নুরজাহান পার্কের রাস্তার মাথা ও বগী তুলাতলা, নাজিরপুর ইউনিয়নের কচুয়া, ধানদী, নিমদী, তাঁতেরকাঠি, কেশবপুর ইউনিয়নের মমিনপুর, ধুলিয়া ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া, ধুলিয়া লঞ্চঘাট, চর সাবুদেবপাশা ও কারখানা নদীর কাছিপাড়া ইউনিয়নের কারখানা পয়েন্টে অবাধে চলে ইলিশ শিকার। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে নামেন। বিশেষ মাধ্যমে প্রশাসনের অভিযানের খবর পৌঁছে যায় জেলেদের কাছে। যার কারণে নিয়মিত অভিযান চললেও ইলিশ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।  ইলিশ মাছ ধরার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ একাধিক টিমে ভাগ হয়ে নদীতে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে দ্রুত গতির ট্রলার ও স্পিড বোট ব্যবহার করা হয়। এসব ট্রলার ও স্পিড বোটের যারা মাঝি থাকেন তারাই জেলেদের কাছে অভিযানের সংবাদ পৌঁছে দেন। এমনকি অভিযানে থাকা মাঝিরা ইলিশ মাছ ধরা এবং বিক্রির সাথেও জড়িত রয়েছেন। তাদেরই একজন স্পিড বোট চালাক মো. নান্নু (৩৫)। তার স্পিড বোট নিয়ে মৎস্য কর্মকর্তা অভিযানে নামেন। অভিযোগ রয়েছে, নান্নু জেলেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অভিযানে নামার সংবাদ জেলেদের কাছে ফাঁস করে দেন। তিনি ধরা ইলিশ মাছ বিক্রি ও পাচারের সাথেও রয়েছে। শনিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কালাইয়া লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায় ৫ মণ ইলিশ মাছসহ তার (নান্নু) স্পিড বোট জব্দ করেন প্রশাসন। এসময় নান্নু পালিয়ে যায়। পরে জব্দকৃত মাছ এতিমাখানায় বিতরণ করেন সহকারী কমিশনার প্রতীক কুমার কুন্ডু। এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধরা মাছ নদীর আশেপাশে গোপনে বিক্রি করা হয়। এ বিক্রির সাথে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত থাকেন। জেলেদের কাছ থেকে কম দামে ইলিশ মাছ কিনেন স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সদস্যেরা। তাদের রয়েছে সিন্ডিকেটও। ওই সিন্ডিকেটের বাহিরে জেলেরা অন্যদের কাছে মাছ বিক্রি করতে পারেন না। জেলেদের কাছ থেকে কেনা বিভিন্ন সাইজের মাছের হালিতে ( ৪পিস) প্রতি ১ থেকে দেড় হাজার টাকা লাভ করেন ওই প্রভাবশালী চক্র। কালাইয়া ইউনিয়নের চরকালাইয়া গ্রামের কার্ডধারী জেলে মো. আলামিন, বগি এলাকার সহিদ মোল্লা ও চন্দ্রদ্বীপের সোহেল বয়াতি জানান, যারা প্রকৃত জেলেরা তারা নদীতে নামেন না। অবরোধের সময় নদীতে ইলিশ বেশি থাকায় একদল মৌসুমি জেলেরা নদীতে নামেন। তাদের পিছনে থাকেন বিভিন্ন দলের নেতারা।  মৎস্য বিভাগের দাবি, নিয়মিত অভিযান চালিয়েও মাছ নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযানের শুরু থেকেই সচেতন করার চেষ্টা করা হলেও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে মাছ ধরা চেষ্টা করছেন। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু আমরা নদীতে নামলেই দূর থেকে তা লক্ষ্য করে তারা পালিয়ে যায়। মাছ ধরা বন্ধ করতে হলে পুরো নদী এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো দরকার। তবে তার জন্য পর্যাপ্ত  জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা নেই। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার ৩ নৌকা, ১টি স্পিড বোট, ৯ জন জেলে ও ৫ মণ মাছ জব্দ করা হয়েছে। আটক জেলেদের মৎস্য সম্পদ রক্ষা আইনে ৩ সপ্তাহের জেল দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যদি মৎস্য বিভাগ বা নৌ পুলিশের কোনো সদস্য বিশেষ কোনো সুবিধা নিয়ে জেলেদের কাছে অভিযানের তথ্য ফাঁস করে এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এয়ারবাস থেকে ১০ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, ক্রয়চুক্তি সই

ম্যানেজ করেই অবাধে ইলিশ শিকার, ‘অসহায়’ মৎস্য বিভাগ

আপডেট সময় ১২:৪৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০২৪

ঢাকা অফিস ॥ দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গত ১৩ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা, বেচা-কেনা ও পরিবহনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার।  আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলছে এ নিষেধাজ্ঞা। তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই পটুয়াখালীর বাউফলে দেশের অন্যতম ইলিশ অভয়াশ্রম কেন্দ্রে তেঁতুলিয়া নদীর ৪০ কিলোমিটার এলাকায় চলছে অবাধে মা ইলিশ নিধনের মহোৎসব। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে কয়েকশ মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো নদী। পুরো নদী জুড়ে ইলিশ নিধনের উৎসব চললেও প্রশাসনের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, ইলিশ রক্ষা অভিযান দলের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই অবাধে ইলিশ নিধন করছেন জেলেরা। ওই অসাধু ব্যক্তিরা বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রশাসনের অভিযানে নামার খবর জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়। এতে জেলেরা সর্তক হয়ে যান। অভিযান শেষে পুনরায় নদীতে জাল নিয়ে নামে তারা। তবে নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যে সব জেলেরা মাছ শিকার করছেন তারা অধিকাংশই মৌসুমি জেলে বলে দাবি করেছেন প্রকৃত জেলেরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তেঁতুলিয়া নদীর চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের বাতির খাল, চরমিয়াজান, চর রায়সাহেব, চর ব্যারেট, কালাইয়া ইউনিয়নের  শৌলা তারের পোল, চরকালাইয়া, নুরজাহান পার্কের রাস্তার মাথা ও বগী তুলাতলা, নাজিরপুর ইউনিয়নের কচুয়া, ধানদী, নিমদী, তাঁতেরকাঠি, কেশবপুর ইউনিয়নের মমিনপুর, ধুলিয়া ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া, ধুলিয়া লঞ্চঘাট, চর সাবুদেবপাশা ও কারখানা নদীর কাছিপাড়া ইউনিয়নের কারখানা পয়েন্টে অবাধে চলে ইলিশ শিকার। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে নামেন। বিশেষ মাধ্যমে প্রশাসনের অভিযানের খবর পৌঁছে যায় জেলেদের কাছে। যার কারণে নিয়মিত অভিযান চললেও ইলিশ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।  ইলিশ মাছ ধরার সাথে সংশ্লিষ্ট এমন একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ একাধিক টিমে ভাগ হয়ে নদীতে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে দ্রুত গতির ট্রলার ও স্পিড বোট ব্যবহার করা হয়। এসব ট্রলার ও স্পিড বোটের যারা মাঝি থাকেন তারাই জেলেদের কাছে অভিযানের সংবাদ পৌঁছে দেন। এমনকি অভিযানে থাকা মাঝিরা ইলিশ মাছ ধরা এবং বিক্রির সাথেও জড়িত রয়েছেন। তাদেরই একজন স্পিড বোট চালাক মো. নান্নু (৩৫)। তার স্পিড বোট নিয়ে মৎস্য কর্মকর্তা অভিযানে নামেন। অভিযোগ রয়েছে, নান্নু জেলেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অভিযানে নামার সংবাদ জেলেদের কাছে ফাঁস করে দেন। তিনি ধরা ইলিশ মাছ বিক্রি ও পাচারের সাথেও রয়েছে। শনিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কালাইয়া লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায় ৫ মণ ইলিশ মাছসহ তার (নান্নু) স্পিড বোট জব্দ করেন প্রশাসন। এসময় নান্নু পালিয়ে যায়। পরে জব্দকৃত মাছ এতিমাখানায় বিতরণ করেন সহকারী কমিশনার প্রতীক কুমার কুন্ডু। এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধরা মাছ নদীর আশেপাশে গোপনে বিক্রি করা হয়। এ বিক্রির সাথে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত থাকেন। জেলেদের কাছ থেকে কম দামে ইলিশ মাছ কিনেন স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সদস্যেরা। তাদের রয়েছে সিন্ডিকেটও। ওই সিন্ডিকেটের বাহিরে জেলেরা অন্যদের কাছে মাছ বিক্রি করতে পারেন না। জেলেদের কাছ থেকে কেনা বিভিন্ন সাইজের মাছের হালিতে ( ৪পিস) প্রতি ১ থেকে দেড় হাজার টাকা লাভ করেন ওই প্রভাবশালী চক্র। কালাইয়া ইউনিয়নের চরকালাইয়া গ্রামের কার্ডধারী জেলে মো. আলামিন, বগি এলাকার সহিদ মোল্লা ও চন্দ্রদ্বীপের সোহেল বয়াতি জানান, যারা প্রকৃত জেলেরা তারা নদীতে নামেন না। অবরোধের সময় নদীতে ইলিশ বেশি থাকায় একদল মৌসুমি জেলেরা নদীতে নামেন। তাদের পিছনে থাকেন বিভিন্ন দলের নেতারা।  মৎস্য বিভাগের দাবি, নিয়মিত অভিযান চালিয়েও মাছ নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযানের শুরু থেকেই সচেতন করার চেষ্টা করা হলেও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে মাছ ধরা চেষ্টা করছেন। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু আমরা নদীতে নামলেই দূর থেকে তা লক্ষ্য করে তারা পালিয়ে যায়। মাছ ধরা বন্ধ করতে হলে পুরো নদী এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো দরকার। তবে তার জন্য পর্যাপ্ত  জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা নেই। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার ৩ নৌকা, ১টি স্পিড বোট, ৯ জন জেলে ও ৫ মণ মাছ জব্দ করা হয়েছে। আটক জেলেদের মৎস্য সম্পদ রক্ষা আইনে ৩ সপ্তাহের জেল দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যদি মৎস্য বিভাগ বা নৌ পুলিশের কোনো সদস্য বিশেষ কোনো সুবিধা নিয়ে জেলেদের কাছে অভিযানের তথ্য ফাঁস করে এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।