ঢাকা ০৪:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
টপ নিউজ :
,এখনও অপেক্ষা রায় কার্যকরের

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ৬ বছর

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতের শেষ ভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে তাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। দেশজুড়ে এই হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্টি হয় ব্যাপক ক্ষোভ ও বিক্ষোভের তরঙ্গ।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দোষীদের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও, বর্তমানে তা আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আবরারের পরিবার আশা করছে, হাইকোর্টের দেওয়া রায়ই সর্বোচ্চ আদালতে বহাল থাকবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ মনে করছে, তারা আপিল বিভাগে ন্যায়বিচার পাবে।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি ও সীমান্তের পানি ভাগাভাগি নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনামূলক স্ট্যাটাস দেওয়ার পর বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরারকে শেরে বাংলা হলের এক কক্ষে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। পরে রাত ৩টার দিকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরের দিন, ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মাত্র ৩৭ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ১৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকার (অপু), মেহেদী হাসান রবিন (শান্ত), ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মাজেদুর রহমান মাজেদ, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, খন্দকার তাবাকারুল ইসলাম (তানভির), হোসেন মোহাম্মদ তোহা, শামীম বিল্লাহ, নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমী, মিজানুর রহমান মিজান, মাহমুদ সেতু, সামসুল আরেফিন রাফাত, মোর্শেদ (অমর্ত্য ইসলাম), এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মোর্শেদ উজ্জামান জিসান ও মুজতবা রাফিদ।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: অমিত সাহা, ইস্তিয়াক আহমেদ মুন্না, আকাশ হোসেন, মুহতাসিম ফুয়াদ ও মোয়াজ আবু হোরায়রা।

২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের রায় অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করতে হলে তা উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। পরবর্তীতে আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল দাখিল করেন।

চলতি বছরের ১৬ মার্চ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল রাখেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেছেন এবং সেখানে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন।

সেদিনের ভয়াবহ রাত

সাক্ষ্য অনুযায়ী, বিকেলে কুষ্টিয়ার নিজ বাড়ি থেকে হলে ফেরার পর আবরার রাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছিলেন। রাত ৮টার দিকে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী এসে তাকে অন্য কক্ষে নিয়ে যায়।

সেখানে তার মোবাইল ও ল্যাপটপ তল্লাশি করা হয় এবং অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে জেরা করা হয়। পরে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। “শিবির ধরা হয়েছে” বলে আরও কয়েকজন নেতাকর্মী যোগ দেন এবং নির্যাতন তীব্রতর হয়।

গভীর রাতে আবরার অচেতন হয়ে পড়লে তার দেহ সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়।

একাধিক ছাত্র জানায়, সেদিন রাতে চিৎকার শোনা গেলেও কেউ ভয়ে কাছে যায়নি। পরে নিরাপত্তাকর্মী ও চিকিৎসক এসে নিশ্চিত করেন, আবরার মারা গেছেন।

তদন্তে যা বেরিয়ে আসে

হলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ছাত্র আবরারকে টেনে-হিঁচড়ে বারান্দা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে ওই কক্ষের নেতাকর্মীদের বেশিরভাগকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তদন্তে নিশ্চিত হয়, ২০১১ নম্বর কক্ষটি দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো।

স্মরণে আবরার

আবরারের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সারাদেশে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণানুষ্ঠান ও আলোচনা সভা।

একই সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবির এ দিনটিকে “নিপীড়নবিরোধী দিবস” হিসেবে পালন করছে, যার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা, দোয়া ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজন করেছে “ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব : স্মরণে শহিদ আবরার ফাহাদ” শীর্ষক সেমিনার ও “স্মরণে মননে আবরার ফাহাদ” শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী।

এয়ারবাস থেকে ১০ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, ক্রয়চুক্তি সই

,এখনও অপেক্ষা রায় কার্যকরের

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ৬ বছর

আপডেট সময় ০২:২০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতের শেষ ভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে তাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। দেশজুড়ে এই হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্টি হয় ব্যাপক ক্ষোভ ও বিক্ষোভের তরঙ্গ।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দোষীদের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও, বর্তমানে তা আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আবরারের পরিবার আশা করছে, হাইকোর্টের দেওয়া রায়ই সর্বোচ্চ আদালতে বহাল থাকবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ মনে করছে, তারা আপিল বিভাগে ন্যায়বিচার পাবে।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি ও সীমান্তের পানি ভাগাভাগি নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনামূলক স্ট্যাটাস দেওয়ার পর বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরারকে শেরে বাংলা হলের এক কক্ষে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। পরে রাত ৩টার দিকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরের দিন, ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মাত্র ৩৭ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ১৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: মেহেদী হাসান রাসেল, অনিক সরকার (অপু), মেহেদী হাসান রবিন (শান্ত), ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মাজেদুর রহমান মাজেদ, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, খন্দকার তাবাকারুল ইসলাম (তানভির), হোসেন মোহাম্মদ তোহা, শামীম বিল্লাহ, নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমী, মিজানুর রহমান মিজান, মাহমুদ সেতু, সামসুল আরেফিন রাফাত, মোর্শেদ (অমর্ত্য ইসলাম), এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মোর্শেদ উজ্জামান জিসান ও মুজতবা রাফিদ।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: অমিত সাহা, ইস্তিয়াক আহমেদ মুন্না, আকাশ হোসেন, মুহতাসিম ফুয়াদ ও মোয়াজ আবু হোরায়রা।

২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের রায় অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করতে হলে তা উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। পরবর্তীতে আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল দাখিল করেন।

চলতি বছরের ১৬ মার্চ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল রাখেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেছেন এবং সেখানে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন।

সেদিনের ভয়াবহ রাত

সাক্ষ্য অনুযায়ী, বিকেলে কুষ্টিয়ার নিজ বাড়ি থেকে হলে ফেরার পর আবরার রাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছিলেন। রাত ৮টার দিকে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী এসে তাকে অন্য কক্ষে নিয়ে যায়।

সেখানে তার মোবাইল ও ল্যাপটপ তল্লাশি করা হয় এবং অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে জেরা করা হয়। পরে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। “শিবির ধরা হয়েছে” বলে আরও কয়েকজন নেতাকর্মী যোগ দেন এবং নির্যাতন তীব্রতর হয়।

গভীর রাতে আবরার অচেতন হয়ে পড়লে তার দেহ সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়।

একাধিক ছাত্র জানায়, সেদিন রাতে চিৎকার শোনা গেলেও কেউ ভয়ে কাছে যায়নি। পরে নিরাপত্তাকর্মী ও চিকিৎসক এসে নিশ্চিত করেন, আবরার মারা গেছেন।

তদন্তে যা বেরিয়ে আসে

হলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ছাত্র আবরারকে টেনে-হিঁচড়ে বারান্দা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে ওই কক্ষের নেতাকর্মীদের বেশিরভাগকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তদন্তে নিশ্চিত হয়, ২০১১ নম্বর কক্ষটি দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো।

স্মরণে আবরার

আবরারের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সারাদেশে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণানুষ্ঠান ও আলোচনা সভা।

একই সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবির এ দিনটিকে “নিপীড়নবিরোধী দিবস” হিসেবে পালন করছে, যার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা, দোয়া ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজন করেছে “ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব : স্মরণে শহিদ আবরার ফাহাদ” শীর্ষক সেমিনার ও “স্মরণে মননে আবরার ফাহাদ” শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী।