নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়ার পৌর এলাকার জুগিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতার বালু ঘাটের দখল নিয়ে দিনভর গোলাগুলি, হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বেশ কয়েকটি মটর সাইকেল ভাংচুর করা হয়েছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে লোকজনদের ধাওয়া করতে দেখা যায় এ সময়। গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে জুগিয়া এলাকায় ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনার সময় বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্ধ শোনা যায়। অনেকেই ছাদ থেকে গোলাগুলির ঘটনা ভিডিও করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মহিদুল ইসলাম জুগিয়া বালু ঘাটের ইজারা নেয়। গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে জুগিয়া বালু ঘাটের অবস্থান। গড়াই খননের বালু জুগিয়া এলাকায় স্তুপ করে রাখা হয়েছে। সেই বালু টেন্ডারের মাধ্যমে ডেকে নেয় আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুল ইসলামসহ অন্যরা।
এর মাঝে ৫ আগষ্টের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে বালু ঘাটের দখল নিতে বিএনপির একটি পক্ষ তৎপর হয়ে ওঠে। ঘাট নিয়ে বারখাদা ও জুগিয়া এলাকায় বিএনপির নেতা-কর্মিরা দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এরপর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আমিরুল ইসলাম, শহর যুবদলের সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান জনি, ছাত্রদল নেতা রাকিবুল ইসলাম রাব্বির সাথে মহিদুলের সমঝোতা হয়। সমঝোতা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের মহিদুল ৪০ ভাগ ও বিএনপি নেতাদের অংশ ৬০ ভাগ অর্থ ভাগাভাগির শর্তে বালু উত্তোলন শুরু হয়। এসব বিএনপির নেতারা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেনের অনুসারী।
আর ভাগ না পেয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের অনুসারী শাহজাহান আলী সাজুর অনুগত কর্মিরা এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জুগিয়া ঘাটে বালু তোলা নিয়ে উত্তেজনা শুরু হয়। বিএনপি নেতা শাহজাহান আলী সাজু এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানালে মহিদুল ও তার সাথে যোগ দেওয়া বিএনপি নেতারা ক্ষুব্ধ হয়। এ সময় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়। সাজুর অনুগত ১৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারন সম্পাদক মিজানুর রহমান ও তার অনুগতরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
বালু ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মহিদুল, তার ভাই ভাতিজা আর বিএনপির একটি পক্ষ গতকাল বুধবার এক হয়ে হাতে অস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দেয়। এ সময় বিএনপি নেতা সাজু ও মিজানুর রহমানের লোকজন ও এলাকার লোকজন একত্র হয়ে তাদের প্রতিহত করতে পাল্টা হামলা চালায়। এ সময় উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অস্ত্র হাতে গুলি ছুঁড়তেই দেখেছে এলাকার লোকজন।
এলাকাবাসী জানায়, জুগিয়া কানাবিলের মোড়ে বাড়ি আব্দুল আজিজের ছেলে ইশতিয়াক অস্ত্র হাতে মহড়া দেয় ও গুলি ছোড়ে। এ সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাবাসীর একটি অংশও সাজুর সাথে এক হয়ে মহিদুলের লোকজনকে তাড়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। পরে মহিদুলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর চালায় তারা।
এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, জুগিয়ায় বালু তোলার কারনে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হানিফ ও তার ভাই আতার দোসর ছিল মহিদুল। তার কারনে এলাকায় মানুষ বসবাস করতে পারছে না। পাকা সড়কটি নষ্ট হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বালু ভর্তি ট্রাক চলার কারনে এ অবস্থা হয়েছে। এ কারনে মানুষ ক্ষুব্ধ।
এলাকার লোকজন জানান, হানিফ ও আতার সাহায্যে নিয়ে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে মহিদুল বালু ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এর আগে অবৈধভাবে এ ঘাট থেকে বালু উত্তোলন করা হতো। পরে গড়াই খননের রাখা বালু বিক্রির জন্য টেন্ডার করা হয় কয়েক বছর ধরে। মহিদুলের সাথে নিয়ে বিএনপির আমিরুল ইসলাম, মিল্টন, জিল্লুর রহমান জনি এখন এক হয়ে বালু তুলছিল। এসব নিয়ে বিএনপি নেতা সাজুর লোকজন এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
মহিদুলের বাড়ি ছাড়াও বিএনপির কার্যালয় ভাংচুর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকার লোকজন। বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ক্যাডার জিকু, রাকিব ও রানাসহ আরো অন্যরা মিলে বিএনপির পার্টি অফিসে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে। তারা বিএনপি নেতা মিজানুর রহমানের সাথে হাত মিলিয়ে আমাদের লোকজনের ওপর হামলা করেছে। আমার সাথে মহিদুলের কোন সম্পর্ক নেই। বালু ঘাট থেকে কোন ভাগ খাই না।’
শাহজাহান আলী সাজু বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুলের সাথে ওয়ার্ড বিএনপির কিছু নেতা এক সাথে বালু উত্তোলন করছিল। এলাকার লোকজন এক হয়ে তাদের বাঁধা দিলে অস্ত্র হাতে হামলা চালায় মহিদুলের ক্যাডার বাহিনী। তারা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। বালু উত্তোলনের ফলে সড়ক নষ্ট হয়ে এলাকার লোকজন চলাফেরা করতে পারে না। এ কারনে পুরো এলাকাবাসী এক হয়ে তাদের প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে।’
কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহফুজুল হক চৌধুরী বলেন, গত দুইদিন ধরে উত্তেজনা চলছে। অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া বিষয়টি তাদের নলেজে আছে। অস্ত্রধারীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’
নিজস্ব সংবাদ : 














