কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ৫ আগষ্টের পর দেশের অন্যতম বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে মিল মালিকদের জিম্মি করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগপন্থী মিল মালিকসহ সাধারন মিলারদেরও হয়রানী করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। এছাড়া স্থাণীয় বিএনপির দুটি গ্র“প থাকায় হয়রানীর মাত্রা আরো বেড়েছে। এক গ্র“পকে চাঁদা দিলে অপর গ্র“পকে চাঁদা না দিলেই মামলায় আসামী করা হচ্ছে। এতে করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আর সদর উপজেলা ও বটতৈল ইউনিয়ন বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের ৪জন নেতা এসব কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। মামলার আসামী হয়ে আত্মগোপনে থাকা খাজানগরের একজন শীর্ষ মিল মালিক বলেন, তিনি কোন দলের রাজনীতি করতেন না। তার কোন পদ-পদবি নেই। আওয়ামী লীগ আমলে হয়রানী থেকে বাঁচতে দলটির কয়েকজন নেতার সাথে ওঠাবসা করতেন। এছাড়া আওয়ামী সমর্থিত চালকল মালিক সমিতির কমিটিতে পদে ছিলেন। এসব কারনে আমার নামে একাধিক মামলা দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীক ভাবে আমাকে কোনঠাসা করতে এ কাজ করেছে প্রতিপক্ষ। কুষ্টিয়া মডেল থানায় ৬ সেপ্টেম্বর রাতে দুটি মামলা রেকর্ড হয়েছে। একটি মামলার বাদী কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দহকুলা ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামের মৃত আকবর আলীর ছেলে আশরাফুল ইসলাম। এ মামলায় ২৫জন নামীয়সহ অজ্ঞাত আরো ৮ থেকে ১০জনকে আসামী করা হয়েছে। তিনি নিজেই আহত হয়েছিলেন। অপর মামলাটি করেছেন কুষ্টিয়া শহরের চর থানাপাড়া এলাকার কোরবান আলীর স্ত্রী রুনা খাতুন। ৫৪জনকে নামীয়সহ অজ্ঞাত ১০/১৫জনকে আসামী করা হয়েছে। রুনা খাতুন ছেলেকে খুঁজতে এসে ৫ আগষ্টের আন্দোলনে ছররা গুলি লেগে আহত হয়েছেন। তার ছেলে পানির মিস্ত্রি রুহুল আমিনও এদিন আহত হয়। দুটি মামলার প্রথম সারিতে আসামী করা হয়েছে মাহবুবউল আলম হানিফসহ দলীয় নেতাদের। তবে এ দুটি মামলায় শুধুমাত্র বটতৈল ইউনিয়নের খাজানগর গ্রামের ১৪জনকে আসামী করা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগ চাল মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ী। এর মধ্যে দেশ এগ্রো লিমিটেডের আব্দুল খালেক, দাদা রাইস মিলের মালিক হাজি আরশাদ আলী, মেসার্স সুবর্ণা এগ্রো ফুডের মালিক জিন্নাহ আলম, ফ্রেস এগ্রো লিমিটেডের মালিক ওমর ফারুকসহ আরও কয়েকজনের নাম। এছাড়া অন্য একটি মামলায় গুরুর দান রাইস মিলের মালিক সুজনকে আসামী করা হয়েছে। দেশের শীর্ষ এসব মিল মালিক আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হানিফ ও আতার সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন। এর মধ্যে ওমর ফারুক সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ পদে আছেন। বাকিরা আওয়ামী লীগ সমর্থিত চালকল মালিক সমিতির নেতা হলেও দলের কোন পদে নেই। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, বটতৈল ইউনিয়নের শুধুমাত্র খাজানগর গ্রামের ব্যবসায়ীদের আসাামী করা হয়েছে। বাকি অন্য কোন গ্রামের একজনও আসামী নেই। একইভাবে রুনা খাতুনের দায়ের করা মামলায় সদর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ১০জনকে ও কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ১১জনকে আসামী করা হয়েছে। চালকল মালিকদের অভিযোগ, ৫ আগষ্টের পর বেশ কয়েকজন চালকল মালিকের বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। তাদের একাধিক মামলায় আসামী করা হয়েছে। এছাড়া নতুন করে আরো দুটি মামলায় আসামী করা হয়েছে শীর্ষ কয়েকজন মিল মালিককে। স্থাণীয় চালকল মালিক সমিতি ও সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিরোধ থেকে তাদের আসামী করা হয়েছে। একই সাথে গণহারে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। চালকল মালিকদের অভিযোগ, টার্গেট করে খাজানগর গ্রামের ব্যবসায়ীদের আসামী করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সবার কাছেই কম বেশি নগদ টাকা থাকে। তাই মামলার আসামী হওয়ার ভয়ে টাকা দিয়ে দিচ্ছেন তারা। তাদের অভিযোগ, বিএনপির দুটি গ্রুপ আছে এলাকায়। সবাইকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। নিরবে কোটি কোটি টাকার চাঁদা উঠছে। কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,‘ উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির কয়েকজন নেতা ছাড়াও সহযোগি সংগঠনের নেতাদের নির্দেশে মামলা হচ্ছে থানায়। বাদীরা কাউকে না চিনলেও তাদের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে সত্যতা মিলেছে। মামলার এজাহারে রুনা খাতুনের দেওয়া মোবাইল নম্বরে (০১৩০২৯৩৮৪৪৬) কল দিলে রিসিভ করেন তার ছেলে রুহুল আমিন। তিনি বলেন, আন্দোলনের দিন আমার মাকে খুঁজতে বের হয়ে আমার ছররা গুলি লাগে। আমার মা আমাকে খুঁজতে আসলে তারও গুলি লাগে। আমরা দুইজনই আহত হয়েছি। কারা গুলি করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে টিয়ার সেলের ধোঁয়া ছোঁড়া হয়। পরে গুলি করা হয়। ধোঁয়ার কারনে কেউকে দেখতে পায়নি। আমার মাও আহত হয়। পার্টি অফিস (বিএনপি) থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। আমি কাউকে চিনি না। আমার মাও কাউকে চেনে না। আমার মা ও আমি দুইজনই মামলা জমা দিয়েছিলাম থানায়। আমি গরীব মানুষ, চিকিৎসা করাতে টাকা লাগে। তাই তাদের কথামত মামলা করেছি। সব কথা বলা যায় না। তার মা কোথায় আছে জানতে চাইলে বলেন, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে। সে কাজ করতে গিয়েছে। অপর মামলার বাদির মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে বলেন, আমি বিএনপির রাজনীতি করি। আন্দোলনের দিন পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের লোকজনও ছিলেন। তাদের অনেককে আমি চিনি। চালকল মালিকদের আসামী করার বিষয়ে বলেন, সবাই কি আর দল করে। অনেকে ডোনার থাকেন, সহযোগিতাও করেন।’ চাঁদাবাজি ও ঢালাও আসামী করার বিষয়ে, জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন,‘ দলের নাম ভাঙ্গিয়ে কোন অপকর্ম করার সুযোগ নেই। নিরীহ কোন মানুষকে আসামী করার বিপক্ষে আমাদের দল। তবে দোষীদের নামে মামলা হলে সেটা আলাদা কথা। দাদা রাইস মিলের মালিক হাজি আরশাদ আলী বলেন,‘ শুধুমাত্র হয়রানী করার জন্য আমাকে আসামী করা হয়েছে। আমরা ব্যবসা করি। যারা সরকার ও ক্ষমতায় থাকে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা লাগে। এ কারনে কেউ যদি মিথ্যা মামলা করে তার জন্য কি করার আছে। তবে এটা বন্ধ হওয়ার প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা না করতে পারলে দেশের ক্ষতি হবে।’ বাংলাদেশ অটো চালকল ওনার্স এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক ও দেশ এগ্রো ফুডের মালিক একাধিক মামলার আসামী এমএ খালেক বলেন,‘ সরাসরি দলের কোন পদে না থেকেও আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। চালকল মালিকর এটা নিয়ে শঙ্কিত। শুধুমাত্র সমিতি নিয়ে দ্বন্দ্বে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় বিয়ষটি জানাবো।তারপরও যদি হয়রানী করা হয় আমাদের মিল বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। এরপর চাল সরবরাহ কমে গেলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে তার দায়ভার কে নেবে? তিনি বলেন, অনেকেই চাঁদা নিচ্ছেন, আবার মামলা সাজিয়ে কাগজ বাড়ি বাড়ি নিয়ে গিয়ে মামলা নাম দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হচ্ছে। মামলা হওয়ার ফাইনাল চার্জশীট থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলেও টাকা দাবি করা হচ্ছে।’ কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মাহফুজুল হক চৌধুরী বলেন, থানায় মামলা হয়েছে বেশ কয়েকটি। পুলিশ মামলার পর তদন্ত করছে। আর খাজানগরে চালকল মালিকদের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি বা অন্য কোন ঘটনায় কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
টপ নিউজ :
ঢালাও মামলা দিলে মিলে চাল উৎপাদন বন্ধের হুঁশিয়ারি
কুষ্টিয়ার খাজানগর চাল মোকাম ঘিরে চলছে নিরব চাঁদাবাজি, দাবিকৃত টাকা না দিলে আসামী করা হচ্ছে মামলায়
-
নিজস্ব সংবাদ : - আপডেট সময় ০৩:০৯:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪
- 55
জনপ্রিয় সংবাদ















