ঢাকা ১২:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছাত্র সংসদ নির্বাচন কী বড় দলগুলোর দ্বন্দ্বের আরেকটি মঞ্চ, এবার কেন ব্যতিক্রম

ঐতিহাসিকভাবে প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার একটি অংশ। এসব নির্বাচন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র এবং ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদদের পরীক্ষাগার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এসব নির্বাচন কি আসলেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও নীতি-নৈতিকতাভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা, নাকি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাববলয়ের প্রতিচ্ছবি মাত্র?

পেছনে ফিরে তাকালে অস্বীকারের উপায় নেই যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ (দলটির সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ), বিএনপি কিংবা বামপন্থি বড় দলগুলোর প্রভাবমুক্ত কখনোই ছিল না। জাতীয় রাজনীতিতে যে দলের প্রভাব বেশি, সাধারণত তাদের ছাত্র সংগঠনও ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার করে। নির্বাচনী প্রচারণা, প্রার্থী বাছাই কিংবা ভোট-পরবর্তী সহিংসতা-সব ক্ষেত্রেই বড় দলের ছায়া থাকে স্পষ্ট।

ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনেক সময় হয়ে ওঠে জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা-হানাহানির ছোট সংস্করণ-যেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় দলীয় মদদ, আর্থিক শক্তি এবং ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সরকারবিরোধী দলগুলোর সমর্থিত প্যানেলই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে থাকে।

প্রশ্ন আসে-এসব নির্বাচনে কি কখনো কোনো স্বতন্ত্র, নির্দলীয়, বড় দলের প্রভাবমুক্ত নেতৃত্ব উঠে এসেছে? ইতিহাস ঘেঁটে খুব বেশি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। কিছু নির্দলীয় বা বিকল্প প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য জায়গা তৈরি করে নিতে পারেনি। বড় দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ, আমানুল্লাহ আমান দু’জনই ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট/ সহ-সভাপতি) পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য স্পষ্টভাবে জাতীয় পর্যায়ের বড় দুই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তোফায়েল আহমেদ ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন ১৯৬৯ সালে।তার রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন শীর্ষ নেতা ছিলেন।১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রনেতা হিসেবে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগের ব্যানারে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং মন্ত্রী পর্যায় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

আমানুল্লাহ আমান ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন ১৯৮৯ সালে। তার রাজনৈতিক আনুগত্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতি।তিনি তখন বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মন্ত্রী হন।

ডাকসু ইতিহাসে মাত্র একজন নারী ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সাঈদা জামান। তিনি ১৯৫৪ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ঢাবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। তার রাজনৈতিক আদর্শ ছিল মূলত বামপন্থি ধারা। তৎকালীন সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো (যেমন: পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন) শক্ত অবস্থানে ছিল এবং তিনি সেই ধারার প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থী হিসেবেই জয়ী হয়েছিলেন।

ডাকসুর ইতিহাসে তিনি আজও একমাত্র নারী ভিপি। নারী নেতৃত্বের বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হয়। স্বাধীনতার আগের সময়কার ছাত্ররাজনীতিতে প্রগতিশীল, বামধারার প্রভাব তখন প্রবল ছিল—সেই প্রবাহেই তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না ডাকসুর ভিপি ও চাকসুর জিএস ছিলেন। তিনি ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন পরিচিত রাজনীতিবিদ। তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে নাগরিক ঐক্য নামে নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।

তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) জিএস (সাধারণ সম্পাদক) ছিলেন। ১৯৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগের এর (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-ছাত্র সংগঠন) প্রার্থী হিসেবে (মূলত ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে তিনি ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছাত্ররাজনীতির দুই বড় মঞ্চ-চাকসু ও ডাকসু—দুটোতেই নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবং দুটো ক্ষেত্রেই তিনি আওয়ামী লীগপন্থি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নুরুল হক নুরের সফলতা কী একক নৈপুণ্য নাকি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ: ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর প্রার্থী হিসেবে ভিপি নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর। এটা ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা, কারণ ছাত্রলীগ দীর্ঘ এক দশক ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। প্রশ্ন হলো-এটা কি শুধুই নুরের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক দর্শনের জয়? বাস্তবে, নুরের জয় ছিল বহুমাত্রিক।

একদিকে ব্যক্তিগত সাহস, আন্দোলনে দৃঢ় উপস্থিতি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছিল তার শক্তির জায়গা। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি শাসনামলে ছাত্রলীগের ওপর জমে থাকা ক্ষোভ। নির্যাতিত-নিপীড়িত ছাত্রছাত্রী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নুরকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তাই বলা যায়, নুরের বিজয় ছিল আংশিক তার ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল, তবে বড় অংশে এটা ছিল সরকারবিরোধী চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

এ প্রসঙ্গে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন মূলধারা রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে জড়িত। এই নির্বাচনকে বড় দলগুলো নিজেদের কর্তৃত্ব রক্ষার ইমেজ হিসেবে দেখে। জাতীয় দলগুলোর পক্ষ নিয়েই তারা নির্বাচনে অংশ নেন। এটি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের জন্য লিটমাস টেস্ট হয়ে দেখা দেয়। তবে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধীদের প্যানেল জয়ী হয়। যদিও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় ২০০৮ সালের পর সেই পরিস্থিতিও পাল্টে যায়। স্থানীয় পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় নির্বাচনের ফলাফল তারা নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয়।’

ঢাবির এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এবারের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে সেই পুরোনো ধারা ভেঙে ইতিবাচক কিছু ঘটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকার কোন দলকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এতে করে দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে ভালো কিছু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’

সব মিলিয়ে দেখা যায়, বলা যায়—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামপন্থি দলের বাইরে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভিপি পদে জয় পাওয়ার ইতিহাস কার্যত নেই। শুধুমাত্র নুরুল হক নুরের ঘটনা আংশিকভাবে ‘দলীয় আনুগত্যহীন’ জয়ের মতো মনে হলেও, সেটিও আসলে সরকারবিরোধী ক্ষোভ ও বিকল্প প্ল্যাটফর্মের রাজনৈতিক দলের সফলতা হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন এখনো ছাত্রসমাজের প্রকৃত নেতৃত্ব সৃষ্টির জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং এগুলো অনেক সময় পরিণত হয় বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হানাহানি এবং ক্ষমতা দেখানোর মঞ্চ হিসেবে। যদি এই নির্বাচনগুলোতে স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সত্যিকারের নির্দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করা যেত, তবে ক্যাম্পাস থেকেই নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো-আজও ক্যাম্পাসের রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির ছায়াতেই আবদ্ধ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ছাত্র সংসদ নির্বাচন কী বড় দলগুলোর দ্বন্দ্বের আরেকটি মঞ্চ, এবার কেন ব্যতিক্রম

আপডেট সময় ০৫:৩০:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ঐতিহাসিকভাবে প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার একটি অংশ। এসব নির্বাচন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র এবং ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদদের পরীক্ষাগার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এসব নির্বাচন কি আসলেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও নীতি-নৈতিকতাভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা, নাকি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাববলয়ের প্রতিচ্ছবি মাত্র?

পেছনে ফিরে তাকালে অস্বীকারের উপায় নেই যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ (দলটির সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ), বিএনপি কিংবা বামপন্থি বড় দলগুলোর প্রভাবমুক্ত কখনোই ছিল না। জাতীয় রাজনীতিতে যে দলের প্রভাব বেশি, সাধারণত তাদের ছাত্র সংগঠনও ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার করে। নির্বাচনী প্রচারণা, প্রার্থী বাছাই কিংবা ভোট-পরবর্তী সহিংসতা-সব ক্ষেত্রেই বড় দলের ছায়া থাকে স্পষ্ট।

ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনেক সময় হয়ে ওঠে জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা-হানাহানির ছোট সংস্করণ-যেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় দলীয় মদদ, আর্থিক শক্তি এবং ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সরকারবিরোধী দলগুলোর সমর্থিত প্যানেলই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে থাকে।

প্রশ্ন আসে-এসব নির্বাচনে কি কখনো কোনো স্বতন্ত্র, নির্দলীয়, বড় দলের প্রভাবমুক্ত নেতৃত্ব উঠে এসেছে? ইতিহাস ঘেঁটে খুব বেশি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। কিছু নির্দলীয় বা বিকল্প প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য জায়গা তৈরি করে নিতে পারেনি। বড় দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ, আমানুল্লাহ আমান দু’জনই ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট/ সহ-সভাপতি) পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য স্পষ্টভাবে জাতীয় পর্যায়ের বড় দুই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তোফায়েল আহমেদ ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন ১৯৬৯ সালে।তার রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন শীর্ষ নেতা ছিলেন।১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রনেতা হিসেবে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগের ব্যানারে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং মন্ত্রী পর্যায় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

আমানুল্লাহ আমান ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন ১৯৮৯ সালে। তার রাজনৈতিক আনুগত্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতি।তিনি তখন বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মন্ত্রী হন।

ডাকসু ইতিহাসে মাত্র একজন নারী ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সাঈদা জামান। তিনি ১৯৫৪ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ঢাবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। তার রাজনৈতিক আদর্শ ছিল মূলত বামপন্থি ধারা। তৎকালীন সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো (যেমন: পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন) শক্ত অবস্থানে ছিল এবং তিনি সেই ধারার প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থী হিসেবেই জয়ী হয়েছিলেন।

ডাকসুর ইতিহাসে তিনি আজও একমাত্র নারী ভিপি। নারী নেতৃত্বের বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হয়। স্বাধীনতার আগের সময়কার ছাত্ররাজনীতিতে প্রগতিশীল, বামধারার প্রভাব তখন প্রবল ছিল—সেই প্রবাহেই তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না ডাকসুর ভিপি ও চাকসুর জিএস ছিলেন। তিনি ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন পরিচিত রাজনীতিবিদ। তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে নাগরিক ঐক্য নামে নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।

তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) জিএস (সাধারণ সম্পাদক) ছিলেন। ১৯৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগের এর (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-ছাত্র সংগঠন) প্রার্থী হিসেবে (মূলত ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে তিনি ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছাত্ররাজনীতির দুই বড় মঞ্চ-চাকসু ও ডাকসু—দুটোতেই নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবং দুটো ক্ষেত্রেই তিনি আওয়ামী লীগপন্থি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নুরুল হক নুরের সফলতা কী একক নৈপুণ্য নাকি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ: ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর প্রার্থী হিসেবে ভিপি নির্বাচিত হন নুরুল হক নুর। এটা ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা, কারণ ছাত্রলীগ দীর্ঘ এক দশক ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। প্রশ্ন হলো-এটা কি শুধুই নুরের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক দর্শনের জয়? বাস্তবে, নুরের জয় ছিল বহুমাত্রিক।

একদিকে ব্যক্তিগত সাহস, আন্দোলনে দৃঢ় উপস্থিতি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছিল তার শক্তির জায়গা। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি শাসনামলে ছাত্রলীগের ওপর জমে থাকা ক্ষোভ। নির্যাতিত-নিপীড়িত ছাত্রছাত্রী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নুরকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তাই বলা যায়, নুরের বিজয় ছিল আংশিক তার ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল, তবে বড় অংশে এটা ছিল সরকারবিরোধী চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

এ প্রসঙ্গে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন মূলধারা রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে জড়িত। এই নির্বাচনকে বড় দলগুলো নিজেদের কর্তৃত্ব রক্ষার ইমেজ হিসেবে দেখে। জাতীয় দলগুলোর পক্ষ নিয়েই তারা নির্বাচনে অংশ নেন। এটি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের জন্য লিটমাস টেস্ট হয়ে দেখা দেয়। তবে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধীদের প্যানেল জয়ী হয়। যদিও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় ২০০৮ সালের পর সেই পরিস্থিতিও পাল্টে যায়। স্থানীয় পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় নির্বাচনের ফলাফল তারা নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয়।’

ঢাবির এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এবারের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে সেই পুরোনো ধারা ভেঙে ইতিবাচক কিছু ঘটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকার কোন দলকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এতে করে দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে ভালো কিছু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’

সব মিলিয়ে দেখা যায়, বলা যায়—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামপন্থি দলের বাইরে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভিপি পদে জয় পাওয়ার ইতিহাস কার্যত নেই। শুধুমাত্র নুরুল হক নুরের ঘটনা আংশিকভাবে ‘দলীয় আনুগত্যহীন’ জয়ের মতো মনে হলেও, সেটিও আসলে সরকারবিরোধী ক্ষোভ ও বিকল্প প্ল্যাটফর্মের রাজনৈতিক দলের সফলতা হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন এখনো ছাত্রসমাজের প্রকৃত নেতৃত্ব সৃষ্টির জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং এগুলো অনেক সময় পরিণত হয় বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হানাহানি এবং ক্ষমতা দেখানোর মঞ্চ হিসেবে। যদি এই নির্বাচনগুলোতে স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সত্যিকারের নির্দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করা যেত, তবে ক্যাম্পাস থেকেই নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো-আজও ক্যাম্পাসের রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির ছায়াতেই আবদ্ধ।