ঢাকা ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘দারোয়ান’ বলে উপহাসের শিকার নয়ন এখন চবি শিক্ষার্থী

‘দারোয়ান’ বলে উপহাসের শিকার নয়ন এখন চবি শিক্ষার্থী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান নয়নের জীবন যেন কেবল একটি গল্প নয়, হাজারও তরুণের আশা, সংগ্রাম আর আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। যশোর বেনাপোলের ছোট্ট এক শহর থেকে উঠে আসা এই তরুণ আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গর্বিত শিক্ষার্থী। কিন্তু তার এই পথচলা ছিল না সহজ কিংবা সরল। প্রতিটি ধাপে ধাপে ছিল সংগ্রাম। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সীমাহীন ত্যাগ আর গভীর ভালোবাসায় সম্ভব হয়েছে স্বপ্ন পূরণ।

নয়ন বেড়ে উঠেছেন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বেনাপোলে। পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট। বাবা মো. মুক্তার আলী বয়সের ভারে অনেক আগেই কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। দুই ভাইয়ের সাধ্যমত সহযোগিতায় ভালোভাবেই চলছিল জীবন। কিন্তু করোনা মহামারিতে সব বদলে যায়। ভাইদের ব্যবসা ও কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারে নেমে আসে অভাবের ছায়া। নয়নের পড়াশোনাও পড়ে যায় অনিশ্চয়তায়।

নয়ন জানান, এসএসসি পাস করলেও কলেজে ভর্তি হওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। অনলাইনে ছোটখাট কাজ করে একটি ল্যাপটপ কিনেছিলেন, কিন্তু কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে সেটা বিক্রি করতে হয়। শুধু ভর্তি হলেই তো শেষ নয়। কলেজে আসা-যাওয়ার দৈনিক ৫০ টাকার ভাড়াও তখন বিলাসিতা মনে হতো।

এমন পরিস্থিতিতে একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে বাঁচার লড়াই—দুটোকেই চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন নয়ন। নিজের উদ্যোগে খুঁজে নেন এমন একটি চাকরি, যাতে ক্লাসও করা যায়, আবার রোজগারও সম্ভব। পরিবার ও বড় ভাইদের সহযোগিতায় বেনাপোল স্থলবন্দরে একটি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নেন।

ডিউটি ছিল তিন শিফটে। নয়ন নিয়েছিলেন বিকেল ৩টা থেকে রাত ১১টা এবং রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত শিফটে। তার দিন শুরু হতো সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে। কোচিং, কলেজ শেষ করে সরাসরি ডিউটি। আবার রাত ১১টার ডিউটি থাকলে সকাল ৭টায় ফিরেই চলে যেতেন কলেজে।

স্বপ্নবাজ নয়ন বলেন, অনেক সময় ক্লাসে চোখে ঘুম ভর করতো। পড়ার সময় পেতাম না। এ জন্য নাইট ডিউটির সময় অফিসে বসে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে বসে বসে বই পড়তাম। অনেকেই ব্যঙ্গ করে ‘দারোয়ান’ও বলেছে। কিন্তু থেমে থাকিনি।

এই অবিচল মনোভাবই তাকে পৌঁছে দেয় উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের কাছে। চাকরি থেকে পাওয়া সামান্য টাকা জমাতে শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য। পড়ালেখার চাপ, ডিউটির ক্লান্তি আর আর্থিক অনিশ্চয়তার মাঝেও চোখ রেখেছিলেন একটি লক্ষ্যই—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে তাকে।

অবশেষে এই স্বপ্ন সত্যি হয়। বাংলাদেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ইউনিটে চান্স পান নয়ন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিক্স, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন এবং সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু তখন আর্থিক সংকটে আবারও থমকে যেতে বসে তার পথচলা।

নয়ন বলেন, আমার সব জমানো টাকা তখন শেষ। ভর্তির জন্য ফোন বিক্রি করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আম্মু তার স্বর্ণের চেন বিক্রি করে আমার ভর্তির টাকা জোগাড় করে দেন।

নয়ন আরও বলেন, এই লড়াইয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা মা-বাবার। তারা সব সময় বলতেন, কষ্ট করলে ফল পাওয়া যায়। আমি সেই কথাই ধরে রেখেছি, আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি নিজে কিছু করার জন্য। আল্লাহর ওপর ভরসা আছে। তিনি তার বান্দাকে নিরাশ করেন না।

নয়নের মতো গল্প হাজারও তরুণের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে, যারা হয়তো কখনো হেরে যেতে বসেছে, থেমে যেতে চেয়েছে। নয়ন বলেন, সংগ্রামকে ভয় নয়, তাকে সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে হয়। কারণ, সম্মান করুণা চেয়ে আসে না, অর্জন করে নিতে হয়। আমি করুণা চাই না, আমি সম্মান পেতে চাই।

জনপ্রিয় সংবাদ

‘দারোয়ান’ বলে উপহাসের শিকার নয়ন এখন চবি শিক্ষার্থী

আপডেট সময় ০৩:৫১:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান নয়নের জীবন যেন কেবল একটি গল্প নয়, হাজারও তরুণের আশা, সংগ্রাম আর আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। যশোর বেনাপোলের ছোট্ট এক শহর থেকে উঠে আসা এই তরুণ আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গর্বিত শিক্ষার্থী। কিন্তু তার এই পথচলা ছিল না সহজ কিংবা সরল। প্রতিটি ধাপে ধাপে ছিল সংগ্রাম। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সীমাহীন ত্যাগ আর গভীর ভালোবাসায় সম্ভব হয়েছে স্বপ্ন পূরণ।

নয়ন বেড়ে উঠেছেন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বেনাপোলে। পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট। বাবা মো. মুক্তার আলী বয়সের ভারে অনেক আগেই কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। দুই ভাইয়ের সাধ্যমত সহযোগিতায় ভালোভাবেই চলছিল জীবন। কিন্তু করোনা মহামারিতে সব বদলে যায়। ভাইদের ব্যবসা ও কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারে নেমে আসে অভাবের ছায়া। নয়নের পড়াশোনাও পড়ে যায় অনিশ্চয়তায়।

নয়ন জানান, এসএসসি পাস করলেও কলেজে ভর্তি হওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। অনলাইনে ছোটখাট কাজ করে একটি ল্যাপটপ কিনেছিলেন, কিন্তু কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে সেটা বিক্রি করতে হয়। শুধু ভর্তি হলেই তো শেষ নয়। কলেজে আসা-যাওয়ার দৈনিক ৫০ টাকার ভাড়াও তখন বিলাসিতা মনে হতো।

এমন পরিস্থিতিতে একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে বাঁচার লড়াই—দুটোকেই চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন নয়ন। নিজের উদ্যোগে খুঁজে নেন এমন একটি চাকরি, যাতে ক্লাসও করা যায়, আবার রোজগারও সম্ভব। পরিবার ও বড় ভাইদের সহযোগিতায় বেনাপোল স্থলবন্দরে একটি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নেন।

ডিউটি ছিল তিন শিফটে। নয়ন নিয়েছিলেন বিকেল ৩টা থেকে রাত ১১টা এবং রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত শিফটে। তার দিন শুরু হতো সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে। কোচিং, কলেজ শেষ করে সরাসরি ডিউটি। আবার রাত ১১টার ডিউটি থাকলে সকাল ৭টায় ফিরেই চলে যেতেন কলেজে।

স্বপ্নবাজ নয়ন বলেন, অনেক সময় ক্লাসে চোখে ঘুম ভর করতো। পড়ার সময় পেতাম না। এ জন্য নাইট ডিউটির সময় অফিসে বসে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে বসে বসে বই পড়তাম। অনেকেই ব্যঙ্গ করে ‘দারোয়ান’ও বলেছে। কিন্তু থেমে থাকিনি।

এই অবিচল মনোভাবই তাকে পৌঁছে দেয় উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের কাছে। চাকরি থেকে পাওয়া সামান্য টাকা জমাতে শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য। পড়ালেখার চাপ, ডিউটির ক্লান্তি আর আর্থিক অনিশ্চয়তার মাঝেও চোখ রেখেছিলেন একটি লক্ষ্যই—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে তাকে।

অবশেষে এই স্বপ্ন সত্যি হয়। বাংলাদেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ইউনিটে চান্স পান নয়ন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিক্স, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন এবং সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু তখন আর্থিক সংকটে আবারও থমকে যেতে বসে তার পথচলা।

নয়ন বলেন, আমার সব জমানো টাকা তখন শেষ। ভর্তির জন্য ফোন বিক্রি করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আম্মু তার স্বর্ণের চেন বিক্রি করে আমার ভর্তির টাকা জোগাড় করে দেন।

নয়ন আরও বলেন, এই লড়াইয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা মা-বাবার। তারা সব সময় বলতেন, কষ্ট করলে ফল পাওয়া যায়। আমি সেই কথাই ধরে রেখেছি, আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি নিজে কিছু করার জন্য। আল্লাহর ওপর ভরসা আছে। তিনি তার বান্দাকে নিরাশ করেন না।

নয়নের মতো গল্প হাজারও তরুণের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে, যারা হয়তো কখনো হেরে যেতে বসেছে, থেমে যেতে চেয়েছে। নয়ন বলেন, সংগ্রামকে ভয় নয়, তাকে সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে হয়। কারণ, সম্মান করুণা চেয়ে আসে না, অর্জন করে নিতে হয়। আমি করুণা চাই না, আমি সম্মান পেতে চাই।