ঢাকা ০৮:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রবীন্দ্র জয়ন্তী : কবিকে শান্তি দিয়েছিল যে নৌকাঘর

তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জমিদারি ছিল ঠাকুর পরিবারের। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসর—এই তিন জায়গায় জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কীর্তিমান কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বয়স তখন তাঁর ২৮ বছর, বিয়ে করেছেন বছর ছয়েক আগে। সাল-মাসের হিসাবে সেটি ১৮৮৯ সালের নভেম্বর। শুরু হলো বিলাতফেরত যুবকের পেশাগত জীবন। তত দিনে লেখালেখি করে নামও কুড়িয়েছেন বেশ।

তখনকার দিনে সড়ক যোগাযোগের কোনো শ্রী ছিল না। রেলগাড়ি ঝমাঝম আসেনি এ দেশে। নদীপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান অবলম্বন। জমিদারির কাজে রবীন্দ্রনাথকে আজ শিলাইদহ তো সপ্তাহখানেক পরে শাহজাদপুর, তার পরের সপ্তাহে হয়তো পতিসর যেতে হয়েছে। ১৯০১ সাল অবধি মোট ১২টি বছর পূর্ববঙ্গে জমিদারি করেছেন তিনি। কীভাবে যেতেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়? আজ পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মদিনে বিভিন্ন বইপত্র থেকে একটি-দুটি বাক্য কুড়িয়ে জোড়া দিয়ে বানানো যাক সে গল্পের শরীর!

রবীন্দ্রনাথের একটি বজরা ছিল। কবি বলতেন বোট। বাংলার প্রমত্ত পদ্মা নদীকে ভালোবাসতেন বলে তিনি এর নাম দিয়েছিলেন পদ্মা। ঢাকার কারিগর দিয়ে এই বজরা বানিয়েছিলেন তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। ভেতরে ছিল দুটি বড় কক্ষ, খাবার ঘর, সঙ্গে আরও দুটি ছোট কক্ষ। অনেক সাধ করে বজরাটি বানালেও ভোগ করে যেতে পারেননি দ্বারকানাথ। উত্তরাধিকার সূত্রে বজরাটির মালিক হলেন পুত্র দেবেন্দ্রনাথ। তাঁর খুব পছন্দের ছিল জলযানটি। রবীন্দ্রনাথসহ তিন পুত্রকে নিয়ে একবার পদ্মায় বেড়াতেও এসেছিলেন। অবশেষে রবীন্দ্রনাথের হাতে পূর্ববঙ্গের জমিদারিকাজের দায়িত্ব আসায় এই বজরার মালিকানাও এল তাঁর হাতে।

বেশ আয়েশের সঙ্গে বজরাটি ব্যবহার করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আহার-নিদ্রা সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল এতে। পরিবার-বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিহারেও যেতেন এই নৌযানে চড়ে। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘হাউজবোটে (বজরা) ঢুকে গেলেই সবকিছু বাড়ির মতো। এর ভেতরকার চমৎকার কারুকাজ আর পারিবারিক পরিবেশে আমি স্বস্তি বোধ করতাম। হাউজবোট পদ্মা বাবার যথেষ্ট কাজে লেগেছে। পৃথিবী যখন তার শান্তি কেড়ে নিয়েছে, তখন তাকে আশ্রয় ও শান্তি দিয়েছে।’ (আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

রবীন্দ্রনাথের আরেকটি বজরার কথা পাওয়া যায় ছোট মেয়ে মীরা দেবীর লেখায়। সেই বজরার নাম ছিল আত্রাই। স্মৃতিকথা বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায় প্রায়ই শিলাইদহে যেতেন। তাঁরা পদ্মার ওপর বজরায় থাকতে খুব ভালোবাসতেন। আমাদের দুটি বজরা ছিল। তাই তাঁরা গেলে কোনো অসুবিধা হতো না। একটি বজরার নাম আগেই উল্লেখ করেছি, অপরটির নাম ছিল “আত্রাই”। আমাদের আরেকটি পরগনাতে আত্রাই নদী ছিল, তার থেকে আত্রাই নামকরণ হয়েছিল।’

বজরায় চড়ে বাংলার নদীপথে ঘোরাঘুরি করেছেন কবি। কবির গান, কবিতা ও গল্পে বারবার এসেছে পালতোলা নৌকার কথা, ধানে বোঝাই নৌকা, পল্লির কুলবধূর লজ্জা মেশানো হাসি, নদীর ঘাটে স্নানরত নারী, মাঝিদের হাঁকডাক। ‘ছিন্নপত্র’-এর তৃতীয় চিঠিতে কবি লিখেছেন, ‘শিলাইদহের অপর পারে একটা চরের সামনে আমাদের বোট লাগানো আছে। প্রকাণ্ড চর-ধু ধু করছে—কোথাও শেষ দেখা যায় না—কেবল মাঝে মাঝে এক এক জায়গায় নদীর রেখা দেখা যায়।’

রবীন্দ্রনাথ কত যে কবিতা ও গান লিখেছেন এই বজরায় চড়ে। শিলাইদহে বোটে বসে লিখেছিলেন ‘সোনার তরী’। তখন ফাল্গুন মাস, কবি লিখলেন, ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা’। কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন লিখেছেন, ‘স্থান ও পাত্রের কেমন সংযোগ হলে কালের বাস্তবতাকে ছাপিয়ে উঠতে পারে ভাবলোক!’

১৮৯১ সালের ৬ অক্টোবর শিলাইদহ থেকে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠিতেও উঠে এল বোটের কথা, ‘পরশু দিন অমনি বোটের জানলার কাছে চুপ করে বসে আছি, একটা জেলেডিঙিতে একজন মাঝি গান গাইতে গাইতে চলে গেল—খুব যে সুস্বর তা নয়—হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহুকাল হল ছেলেবেলায় বাবামশায়ের সঙ্গে বোটে করে পদ্মায় আসছিলুম।—একদিন রাত্তির প্রায় দুটোর সময় ঘুম ভেঙে যেতেই বোটের জানলাটা তুলে ধরে মুখ বাড়িয়ে দেখলুম, নিস্তরঙ্গ নদীর উপরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না হয়েছে, একটি ছোট্ট ডিঙিতে একজন ছোকরা একা একলা দাঁড় বেয়ে চলেছে, এমনি মিষ্টি গলায় গান ধরেছে—গান তার পূর্বে তেমন মিষ্টি কখনো শুনিনি। হঠাৎ মনে হল আবার যদি জীবনটা ঠিক সেই দিন থেকে ফিরে পাই!’

বজরাটি কখনো ভাসত তীর থেকে একটু দূরে। তখন ডিঙিনৌকায় এতটুকু পথ গিয়ে তাতে উঠে বসতেন কবি। আবার বজরা থেকে যখন নামতেন, একটি বিশেষ চেয়ারে কবিকে বসিয়ে চারজন পেয়াদা তাঁকে পৌঁছে দিতেন কুঠিবাড়িতে।

একবার পদ্মা বোটে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন কবি। মরেও যেতে পারতেন। ১৮৯২ সালের জুলাই মাস, সকালবেলা। সেবারও জমিদারির কাজে শিলাইদহে আছেন কবি। ভরা বর্ষা। কবি পদ্মা বোটে সেদিন গোরাই নদীর বুকে। গোরাইয়ের সেদিন ভরা যৌবন। ভরা নদীর সৌন্দর্যে মোহিত কবি। হুহু করে বোট দুলে দুলে চলছে। চলতে চলতেই গোরাই নদীর সেতু দেখা গেল। বোটের মাস্তুল সেতুতে বাধবে কি না, তাই নিয়ে তরজা শুরু হলো মাঝিদের। খেয়াল নেই যে বোট সেতুর কাছে চলে এসেছে। মাঝিদের কোনো বুদ্ধি কাজে লাগল না। দেখা গেল, সেতুতে মাস্তুল বেধে যাচ্ছে এবং সেখানে পানির একটি ঘূর্ণিও আছে।

দেখতে দেখতে বোটটা সেতুর ওপর গিয়ে পড়ল। মাস্তুল মড়মড় করে কাত হতে লাগল। এমন সময় আর একটি নৌকা তাড়াতাড়ি দাঁড় বেয়ে এসে কবিকে তুলে নিল।
পরে বোটে বসেই স্ত্রী মৃণালিনীকে এ ঘটনার কথা লিখেছিলেন কবি, ‘আজ আর একটু হলেই আমার দফা নিকেশ হয়েছিল। তরীর সঙ্গে দেহতরী আর একটু হলেই ডুবেছিল।’

রবীন্দ্রনাথের সেই বজরার অস্তিত্ব এখন আর নেই। তবে এতে ওঠার একটি সিঁড়ি সংরক্ষিত আছে শিলাইদহে কুঠিবাড়ির দোতলায়। রবীন্দ্রনাথের বজরাটি কেমন ছিল, এখনকার প্রজন্মকে সে ধারণা দিতে একটি উদ্যোগ নিয়েছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। তাঁদের তত্ত্বাবধানে ২০১১ সালে শিলাইদহে কুঠিবাড়িতে তৈরি করা হয় ‘হাউস বোট পদ্মা’।

বিআইডব্লিউটিএর নকশায় খুলনার আটজন কারিগর এই বোট তৈরি করেন। চাম্বলের কাঠ দিয়ে নৌকাটি বানাতে খরচ হয় পাঁচ লাখ টাকা।

কুঠিবাড়িতে গেলে দেখা যায়, সেখানকার বকুলতলা পুকুরে ভাসছে পরিত্যক্ত বজরাটি।

ডিপজলের দায়িত্ব পালনে বাধা নেই চলচ্চিত্র সমিতিতে

রবীন্দ্র জয়ন্তী : কবিকে শান্তি দিয়েছিল যে নৌকাঘর

আপডেট সময় ১১:৪৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ মে ২০২৪

তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জমিদারি ছিল ঠাকুর পরিবারের। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসর—এই তিন জায়গায় জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কীর্তিমান কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বয়স তখন তাঁর ২৮ বছর, বিয়ে করেছেন বছর ছয়েক আগে। সাল-মাসের হিসাবে সেটি ১৮৮৯ সালের নভেম্বর। শুরু হলো বিলাতফেরত যুবকের পেশাগত জীবন। তত দিনে লেখালেখি করে নামও কুড়িয়েছেন বেশ।

তখনকার দিনে সড়ক যোগাযোগের কোনো শ্রী ছিল না। রেলগাড়ি ঝমাঝম আসেনি এ দেশে। নদীপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান অবলম্বন। জমিদারির কাজে রবীন্দ্রনাথকে আজ শিলাইদহ তো সপ্তাহখানেক পরে শাহজাদপুর, তার পরের সপ্তাহে হয়তো পতিসর যেতে হয়েছে। ১৯০১ সাল অবধি মোট ১২টি বছর পূর্ববঙ্গে জমিদারি করেছেন তিনি। কীভাবে যেতেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়? আজ পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মদিনে বিভিন্ন বইপত্র থেকে একটি-দুটি বাক্য কুড়িয়ে জোড়া দিয়ে বানানো যাক সে গল্পের শরীর!

রবীন্দ্রনাথের একটি বজরা ছিল। কবি বলতেন বোট। বাংলার প্রমত্ত পদ্মা নদীকে ভালোবাসতেন বলে তিনি এর নাম দিয়েছিলেন পদ্মা। ঢাকার কারিগর দিয়ে এই বজরা বানিয়েছিলেন তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। ভেতরে ছিল দুটি বড় কক্ষ, খাবার ঘর, সঙ্গে আরও দুটি ছোট কক্ষ। অনেক সাধ করে বজরাটি বানালেও ভোগ করে যেতে পারেননি দ্বারকানাথ। উত্তরাধিকার সূত্রে বজরাটির মালিক হলেন পুত্র দেবেন্দ্রনাথ। তাঁর খুব পছন্দের ছিল জলযানটি। রবীন্দ্রনাথসহ তিন পুত্রকে নিয়ে একবার পদ্মায় বেড়াতেও এসেছিলেন। অবশেষে রবীন্দ্রনাথের হাতে পূর্ববঙ্গের জমিদারিকাজের দায়িত্ব আসায় এই বজরার মালিকানাও এল তাঁর হাতে।

বেশ আয়েশের সঙ্গে বজরাটি ব্যবহার করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আহার-নিদ্রা সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল এতে। পরিবার-বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিহারেও যেতেন এই নৌযানে চড়ে। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘হাউজবোটে (বজরা) ঢুকে গেলেই সবকিছু বাড়ির মতো। এর ভেতরকার চমৎকার কারুকাজ আর পারিবারিক পরিবেশে আমি স্বস্তি বোধ করতাম। হাউজবোট পদ্মা বাবার যথেষ্ট কাজে লেগেছে। পৃথিবী যখন তার শান্তি কেড়ে নিয়েছে, তখন তাকে আশ্রয় ও শান্তি দিয়েছে।’ (আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

রবীন্দ্রনাথের আরেকটি বজরার কথা পাওয়া যায় ছোট মেয়ে মীরা দেবীর লেখায়। সেই বজরার নাম ছিল আত্রাই। স্মৃতিকথা বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায় প্রায়ই শিলাইদহে যেতেন। তাঁরা পদ্মার ওপর বজরায় থাকতে খুব ভালোবাসতেন। আমাদের দুটি বজরা ছিল। তাই তাঁরা গেলে কোনো অসুবিধা হতো না। একটি বজরার নাম আগেই উল্লেখ করেছি, অপরটির নাম ছিল “আত্রাই”। আমাদের আরেকটি পরগনাতে আত্রাই নদী ছিল, তার থেকে আত্রাই নামকরণ হয়েছিল।’

বজরায় চড়ে বাংলার নদীপথে ঘোরাঘুরি করেছেন কবি। কবির গান, কবিতা ও গল্পে বারবার এসেছে পালতোলা নৌকার কথা, ধানে বোঝাই নৌকা, পল্লির কুলবধূর লজ্জা মেশানো হাসি, নদীর ঘাটে স্নানরত নারী, মাঝিদের হাঁকডাক। ‘ছিন্নপত্র’-এর তৃতীয় চিঠিতে কবি লিখেছেন, ‘শিলাইদহের অপর পারে একটা চরের সামনে আমাদের বোট লাগানো আছে। প্রকাণ্ড চর-ধু ধু করছে—কোথাও শেষ দেখা যায় না—কেবল মাঝে মাঝে এক এক জায়গায় নদীর রেখা দেখা যায়।’

রবীন্দ্রনাথ কত যে কবিতা ও গান লিখেছেন এই বজরায় চড়ে। শিলাইদহে বোটে বসে লিখেছিলেন ‘সোনার তরী’। তখন ফাল্গুন মাস, কবি লিখলেন, ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা’। কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন লিখেছেন, ‘স্থান ও পাত্রের কেমন সংযোগ হলে কালের বাস্তবতাকে ছাপিয়ে উঠতে পারে ভাবলোক!’

১৮৯১ সালের ৬ অক্টোবর শিলাইদহ থেকে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠিতেও উঠে এল বোটের কথা, ‘পরশু দিন অমনি বোটের জানলার কাছে চুপ করে বসে আছি, একটা জেলেডিঙিতে একজন মাঝি গান গাইতে গাইতে চলে গেল—খুব যে সুস্বর তা নয়—হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহুকাল হল ছেলেবেলায় বাবামশায়ের সঙ্গে বোটে করে পদ্মায় আসছিলুম।—একদিন রাত্তির প্রায় দুটোর সময় ঘুম ভেঙে যেতেই বোটের জানলাটা তুলে ধরে মুখ বাড়িয়ে দেখলুম, নিস্তরঙ্গ নদীর উপরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না হয়েছে, একটি ছোট্ট ডিঙিতে একজন ছোকরা একা একলা দাঁড় বেয়ে চলেছে, এমনি মিষ্টি গলায় গান ধরেছে—গান তার পূর্বে তেমন মিষ্টি কখনো শুনিনি। হঠাৎ মনে হল আবার যদি জীবনটা ঠিক সেই দিন থেকে ফিরে পাই!’

বজরাটি কখনো ভাসত তীর থেকে একটু দূরে। তখন ডিঙিনৌকায় এতটুকু পথ গিয়ে তাতে উঠে বসতেন কবি। আবার বজরা থেকে যখন নামতেন, একটি বিশেষ চেয়ারে কবিকে বসিয়ে চারজন পেয়াদা তাঁকে পৌঁছে দিতেন কুঠিবাড়িতে।

একবার পদ্মা বোটে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন কবি। মরেও যেতে পারতেন। ১৮৯২ সালের জুলাই মাস, সকালবেলা। সেবারও জমিদারির কাজে শিলাইদহে আছেন কবি। ভরা বর্ষা। কবি পদ্মা বোটে সেদিন গোরাই নদীর বুকে। গোরাইয়ের সেদিন ভরা যৌবন। ভরা নদীর সৌন্দর্যে মোহিত কবি। হুহু করে বোট দুলে দুলে চলছে। চলতে চলতেই গোরাই নদীর সেতু দেখা গেল। বোটের মাস্তুল সেতুতে বাধবে কি না, তাই নিয়ে তরজা শুরু হলো মাঝিদের। খেয়াল নেই যে বোট সেতুর কাছে চলে এসেছে। মাঝিদের কোনো বুদ্ধি কাজে লাগল না। দেখা গেল, সেতুতে মাস্তুল বেধে যাচ্ছে এবং সেখানে পানির একটি ঘূর্ণিও আছে।

দেখতে দেখতে বোটটা সেতুর ওপর গিয়ে পড়ল। মাস্তুল মড়মড় করে কাত হতে লাগল। এমন সময় আর একটি নৌকা তাড়াতাড়ি দাঁড় বেয়ে এসে কবিকে তুলে নিল।
পরে বোটে বসেই স্ত্রী মৃণালিনীকে এ ঘটনার কথা লিখেছিলেন কবি, ‘আজ আর একটু হলেই আমার দফা নিকেশ হয়েছিল। তরীর সঙ্গে দেহতরী আর একটু হলেই ডুবেছিল।’

রবীন্দ্রনাথের সেই বজরার অস্তিত্ব এখন আর নেই। তবে এতে ওঠার একটি সিঁড়ি সংরক্ষিত আছে শিলাইদহে কুঠিবাড়ির দোতলায়। রবীন্দ্রনাথের বজরাটি কেমন ছিল, এখনকার প্রজন্মকে সে ধারণা দিতে একটি উদ্যোগ নিয়েছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। তাঁদের তত্ত্বাবধানে ২০১১ সালে শিলাইদহে কুঠিবাড়িতে তৈরি করা হয় ‘হাউস বোট পদ্মা’।

বিআইডব্লিউটিএর নকশায় খুলনার আটজন কারিগর এই বোট তৈরি করেন। চাম্বলের কাঠ দিয়ে নৌকাটি বানাতে খরচ হয় পাঁচ লাখ টাকা।

কুঠিবাড়িতে গেলে দেখা যায়, সেখানকার বকুলতলা পুকুরে ভাসছে পরিত্যক্ত বজরাটি।