ঢাকা ০৯:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

টেকসই উন্নয়নের জন্য কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা চান প্রধানমন্ত্রী

  • ডিপি ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:৫০:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪
  • 5

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যা টেকসই উন্নয়নের মূল উপাদান। তিনি বলেন, বিশ্বের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।

আজ রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘আইসিপিডি-৩০: জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বৈশ্বিক সংলাপ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী ইভেন্টের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণে এ কথা বলেন। বাংলাদেশ, বুলগেরিয়া এবং জাপান ও ইউএনএফপিএ’র সঙ্গে একত্রে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সংলাপ পরিবর্তনশীল জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জগুলো এবং সুযোগগুলো খুঁজে বের করে আলোচনার বিশ্বের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। খবর বাসসের

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের রূপান্তর একটি সমৃদ্ধ বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিমাণ ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও আন্তরিক হতে হবে।

সরকার প্রধান বলেন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সংলাপ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ জাতিসংঘে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অব দ্যা ফিউচার’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে সহায়ক হবে। জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ‘সামিট অব দ্যা ফিউচার’-এর ঘোষণাপত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয় ব্যক্ত করবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শেখ হাসিনা ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য অপরিহার্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সেখানে মানুষ ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আশা করি, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে সবার বিশেষ করে নারী ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে জনস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বিশ্বের সব মানুষের বিশেষ করে মা, শিশু ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

সরকার প্রধান আরও বলেন, একইসঙ্গে সংঘাত ও রাজনৈতিক কারণে উপদ্রুত ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দেওয়াও অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।

এ সময় তিনি মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং ইসরায়েলের গণহত্যা ও আগ্রাসনের ফলে নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের কথা। বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু ফিলিস্তিনে আজ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ইউএনএফপি’র নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া কানেম, মালদ্বীপের সামাজিক ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রী আইশাথ শিহাম, কিরিবাতির নারী, যুব, ক্রীড়া ও সামাজিকবিষয়ক মন্ত্রী মার্টিন মোরেত্তি, জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী ইয়াসুশি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন। বুলগেরিয়া সরকারের প্রতিনিধিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে তার সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ২০০৯ সালে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর আমরা ‘আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন’-এর ১৫টি মূলনীতি বাস্তবায়নে জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০১২ প্রণয়ন করি।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করতে জাতীয় জনসংখ্যা নীতিমালা-২০১২-কে আরও হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, অতি সম্প্রতি আমরা জাতীয় জনসংখ্যা নীতিমালা-২০১২ কে হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হালনাগাদ নীতিমালার মাধ্যমে কর্মক্ষম জনগোষ্টিকে দক্ষতা উন্নয়ন, অগ্রগতি, এবং বুনিয়াদি শিক্ষার মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে পরিণত করা হবে। এই নীতিমালা ২০৪১ সাল থেকে ২০৬১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ বছর ৩ মাসে পৌঁছেছিল।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ কর্মক্ষম। মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার হ্রাস, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা, শিশু ও কিশোর-কিশোরী প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করি।

স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে তাঁর সরকারের চালু করা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাসহ ৩০ প্রকারের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার ক্লিনিকে ‘স্কিলড বার্থ এটেনডেন্স’ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র বা পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক হতে মা, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এরমধ্যে ২ হাজার ২০০টি কেন্দ্র হতে সার্বক্ষণিক স্বাভাবিক প্রসব সেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রসূতিসেবা প্রদানের জন্য এসব কেন্দ্রে ৪ জন করে ধাত্রী নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার ধাত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩ হাজার মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

মা ও শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৩ লাখ উপকারভোগীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি কর্মস্থলে ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র’ স্থাপনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু হার প্রতি হাজারে ২১ জন। যা ২০০৬ সালে ছিল হাজারে ৮৪ জন। একইভাবে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২০০৬ সালের ৩৭০ জন থেকে ১৩৬ জনে হ্রাস পেয়েছে।

বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই, উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের মেয়েদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে তাদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে।’

তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে আমরা ১ হাজার ২৫৩টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবা কেন্দ্রে কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য সেবা কর্নার প্রতিষ্ঠা করেছি। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত প্রায় ৫০ লাখ কিশোরীকে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দেশব্যাপী ‘স্কুল মিল’ চালু করা হয়েছে।

২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের বিশ্বের সর্ববৃহৎ কর্মসূচি চালুর অংশ হিসেবে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ৪৬৪ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান সরকার প্রধান। উপরন্তু নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি ব্যবস্থা চালু এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার জাতীয় বাজেটের মোট ৩০ শতাংশ নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য বরাদ্দ রেখেছে। বেইজিং ঘোষণা ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও জাতীয় কর্মসূচি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।  

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের শ্রম শক্তির ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইসিটি খাতে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ’ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৩’ অনুযায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং এই অঞ্চলে প্রথম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিযোগিদের অংশগ্রহণ আগের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ৩৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি ছিল।

ডিপজলের দায়িত্ব পালনে বাধা নেই চলচ্চিত্র সমিতিতে

টেকসই উন্নয়নের জন্য কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা চান প্রধানমন্ত্রী

আপডেট সময় ১২:৫০:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যকর জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যা টেকসই উন্নয়নের মূল উপাদান। তিনি বলেন, বিশ্বের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।

আজ রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘আইসিপিডি-৩০: জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বৈশ্বিক সংলাপ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী ইভেন্টের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণে এ কথা বলেন। বাংলাদেশ, বুলগেরিয়া এবং জাপান ও ইউএনএফপিএ’র সঙ্গে একত্রে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সংলাপ পরিবর্তনশীল জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জগুলো এবং সুযোগগুলো খুঁজে বের করে আলোচনার বিশ্বের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। খবর বাসসের

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের রূপান্তর একটি সমৃদ্ধ বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা খাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিমাণ ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও আন্তরিক হতে হবে।

সরকার প্রধান বলেন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সংলাপ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ জাতিসংঘে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অব দ্যা ফিউচার’-এর জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে সহায়ক হবে। জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ‘সামিট অব দ্যা ফিউচার’-এর ঘোষণাপত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয় ব্যক্ত করবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শেখ হাসিনা ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য অপরিহার্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার আরও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সেখানে মানুষ ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আশা করি, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সেখানে সবার বিশেষ করে নারী ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে জনস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বিশ্বের সব মানুষের বিশেষ করে মা, শিশু ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

সরকার প্রধান আরও বলেন, একইসঙ্গে সংঘাত ও রাজনৈতিক কারণে উপদ্রুত ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দেওয়াও অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।

এ সময় তিনি মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং ইসরায়েলের গণহত্যা ও আগ্রাসনের ফলে নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের কথা। বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু ফিলিস্তিনে আজ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ইউএনএফপি’র নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া কানেম, মালদ্বীপের সামাজিক ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রী আইশাথ শিহাম, কিরিবাতির নারী, যুব, ক্রীড়া ও সামাজিকবিষয়ক মন্ত্রী মার্টিন মোরেত্তি, জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী ইয়াসুশি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন। বুলগেরিয়া সরকারের প্রতিনিধিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে তার সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ২০০৯ সালে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর আমরা ‘আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন’-এর ১৫টি মূলনীতি বাস্তবায়নে জাতীয় জনসংখ্যা নীতি-২০১২ প্রণয়ন করি।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করতে জাতীয় জনসংখ্যা নীতিমালা-২০১২-কে আরও হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, অতি সম্প্রতি আমরা জাতীয় জনসংখ্যা নীতিমালা-২০১২ কে হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হালনাগাদ নীতিমালার মাধ্যমে কর্মক্ষম জনগোষ্টিকে দক্ষতা উন্নয়ন, অগ্রগতি, এবং বুনিয়াদি শিক্ষার মাধ্যমে জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে পরিণত করা হবে। এই নীতিমালা ২০৪১ সাল থেকে ২০৬১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ বছর ৩ মাসে পৌঁছেছিল।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ কর্মক্ষম। মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার হ্রাস, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা, শিশু ও কিশোর-কিশোরী প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করি।

স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে তাঁর সরকারের চালু করা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাসহ ৩০ প্রকারের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার ক্লিনিকে ‘স্কিলড বার্থ এটেনডেন্স’ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ৩ হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র বা পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক হতে মা, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এরমধ্যে ২ হাজার ২০০টি কেন্দ্র হতে সার্বক্ষণিক স্বাভাবিক প্রসব সেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রসূতিসেবা প্রদানের জন্য এসব কেন্দ্রে ৪ জন করে ধাত্রী নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার ধাত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩ হাজার মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

মা ও শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৩ লাখ উপকারভোগীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি কর্মস্থলে ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র’ স্থাপনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু হার প্রতি হাজারে ২১ জন। যা ২০০৬ সালে ছিল হাজারে ৮৪ জন। একইভাবে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২০০৬ সালের ৩৭০ জন থেকে ১৩৬ জনে হ্রাস পেয়েছে।

বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই, উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের মেয়েদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখে তাদের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে।’

তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে আমরা ১ হাজার ২৫৩টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবা কেন্দ্রে কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য সেবা কর্নার প্রতিষ্ঠা করেছি। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত প্রায় ৫০ লাখ কিশোরীকে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দেশব্যাপী ‘স্কুল মিল’ চালু করা হয়েছে।

২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের বিশ্বের সর্ববৃহৎ কর্মসূচি চালুর অংশ হিসেবে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ৪৬৪ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান সরকার প্রধান। উপরন্তু নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি ব্যবস্থা চালু এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার জাতীয় বাজেটের মোট ৩০ শতাংশ নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য বরাদ্দ রেখেছে। বেইজিং ঘোষণা ও কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও জাতীয় কর্মসূচি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।  

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের শ্রম শক্তির ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইসিটি খাতে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ’ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৩’ অনুযায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং এই অঞ্চলে প্রথম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিযোগিদের অংশগ্রহণ আগের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ৩৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি ছিল।