ঢাকা ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
টপ নিউজ :
কুষ্টিয়ায় পুুকুরে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু মরদেহ ফেরত পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবী পরিবারের চল্লিশ উর্ধ বয়সী স্কাউটারদের পায়ে হেঁটে ৫০ কিলোমিটার পরিভ্রমণে যাত্রা বেইলি রোডে আগুনে প্রাণ গেল ২ সাংবাদিকের কাচ্চি ভাই নয়, নিচের দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত: র‌্যাব বেইলি রোডে আগুন: মৃতের সংখ্যা বাড়ার কারণ জানালেন চিকিৎসক ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামের নির্মাণাধীন হিমাগারের আগুন বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাষ্ট্রপতির শোক বেইলি রোডের আগুন লাগা বহুতল ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না: প্রধানমন্ত্রী ভবনে ভেন্টিলেশন ছিল না, নিহতরা ধোঁয়ায় মারা গেছেন

কুষ্টিয়ায় কিশোর গ্যাং ভয়ঙ্কর

ডেইলী পোস্ট:
আশির দশকে কুষ্টিয়া তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের নাম ছিল চরমপন্থী সন্ত্রাসী ও সংগঠন। নানা নামে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য সংগঠন। শ্রেণি শত্রু খতমের নামে মানুষ খুন ছিল তাদের প্রধান কাজ। এসব কারনে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ছিলনা। রাতে ঘুমাতে পারতনা মানুষ। তবে নব্বই দশকের শেষের দিকে সেই আতঙ্ক অনেকটাই কেটে যায়। ২০০৪ সালের পর র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশী অভিযানে পতন ঘটে চরমপন্থী স¤্রাজ্যের। তবে কুষ্টিয়াবাসীর জন্য নতুন করে দু:সংবাদ কিশোর গ্যাংয়ের আত্মপ্রকাশ। ২০১৫ সালের পর থেকে কুষ্টিয়া শহরে ভদ্র সমাজের কতিপয় বখে যাওয়া কিশোর একত্রিত হয়ে নানা অপকর্মে জড়ালেও তার ভয়ানক পরিনতি দেখা যায় ২০২০ সালের পর। বিশেষ করে করোনাকাল থেকে আত্মপ্রকাশ এসব গ্যাং দ্বারা একাধিক চুরি ছিনতাই, মাদকাশক্ত, অপহরণসহ হত্যাকান্ডের মতো নানা অপরাধ সংঘঠিত হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ছোট ছোট দলে বিভক্ত এসব কিশোর গ্যাং একে অন্যের উপর হামলা পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটাতে থাকে। অভিযোগ আছে এসব কিশোর গ্যাংকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মদদ যোগান রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীরা।
নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলে এসব কিশোরদের নানা ভাবে দলে টানেন। মূলত যুব ও সিনিয়র ছাত্রনেতারা এই সব কিশোরদের তথাকথিত বড় ভাই। বার্থ ডেসহ বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানে এই সমস্ত বড় ভাইয়েরা এদের নানা অপকর্মে ব্যবহার করে অর্জিত টাকা দিয়ে মদদ যুগিয়ে থাকেন। বিনিময়ে নির্বোধ এসব কিশোররা বড় ভাইদের দল ভারী করে। আধিপত্য মাদকচক্রের সম্পৃক্ততায় হিরোইজম বোধে নিজেদের উপস্থাপন করতে গিয়ে কোমলমতি এসব শিশু শিক্ষার্থীরা পা বাড়াচ্ছে অন্ধকার অপরাধ জগতে। সাম্প্রতিক সময়ে শহরে বিভিন্ন এলকায় এসব সমবয়সীদের মধ্যে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনাও বেড়ে গেছে। সহজলভ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির নানা ডিভাইসে অ্যাপস ব্যবহার করে নিজেরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে ২০১৪ সালের পর কুষ্টিয়া শহরের আলফা মোড়ে অমি নামে এক কিশোরের হাত ধরে কিশোর অপরাধের যাত্রা শুরু। তাতে যুক্ত হন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কিশোর গ্যাং লিডার এসকে সজিব। গত শনিবার কুষ্টিয়ার হরিপুরের পদ্মার চর এলাকা থেকে মিলন হোসেন নামে যে যুবকের ৯টুকরো মরদেহ উদ্ধার করা হয় তাকে নির্মমভাহে হত্যা করে এই এসকে সজিব নামে যুবকের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ। তিনি বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের বহিস্কৃত নেতা। সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। ওই মামলায় প্রধান আসামী হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। বর্তমানে অমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও তিনি কিশোর অপরাধী ছিলেননা দাবী করে থাকতেন বরাবরই।
বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন মোড়ে ৩০টির অধিক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। আর এসব কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন সমাজের কতিপয় ভদ্রলোকের বখে যাওয়া সন্তান। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, চুরি ছিনতাই, জমি দখল, নারী দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ, টেন্ডারবাজি ইত্যাদী অপকর্মই তাদের প্রধান কাজ। তবে এসব অপকর্মের শেল্টারদাতা ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা। তাদের প্রয়োজনে এসব কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করা হয়। সভা সমাবেশ, মিছিল মিটিংয়ে দেখা যায় তাদের সরব উপস্থিতি।
কিশোর গ্যাংয়ের কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মকান্ড ও তথ্য তুলে ধরা হলো:
২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার বেলা সাড়ে বারোটার দিকে কুষ্টিয়া শহরতলীর হাটশ হরিপুর বাজারে কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত জখমে গুরুতর আহত হয় আকাশ ও ইমন নামের দুজন কিশোর। এঘটনায় তামিম ইকবাল জয় নামক এক কিশোরকে আটক করে পুলিশ। আকাশ শালদহ গ্রামের আকমলের ছেলে ও ইমন একই এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে।
গত ২০২১ সালের ১২ই নভেম্বর শুক্রবার বিকেল ৫ টার সময় শহরের থানাপাড়া এলাকার কুষ্টিয়া হাইস্কুল মাঠে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় রক্তাক্ত জখম হয় গ্যাং লিডার সজিব শেখ(২২)নামে এক যুবক। ঘটনার সময় প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং জিবি গ্রুপের হৃদয়সহ সংশ্লিষ্টরা তাকে ডেকে নিয়ে হামলা চালায় বলে কুষ্টিয়া মডেল থানায় দেয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়। আহত সজিব ছাত্র লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে নিশ্চিত করেন শহর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে।
২০২১ সালের ১৫নভেম্বর দুপুরে কুষ্টিয়য় শহরের সাদ্দাম বাজার এলাকার বাসিন্দা চালকল মালিক লোকমান হোসেনের ছেলে সোহানকে (২২)কে অপহরণ করে আটকে রাখে কুখ্যাত কিশোর গ্যাং লিডার সজিবের নেতৃত্বে। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানায় ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে সোহানের পিতার এমন অভিযোগের সূত্র ধরে মডেল থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে অপহৃত সোহানকে উদ্ধারসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করে পুলিশ। যদিও কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশের দাবি এটা অপহরণ নয়; পূর্ব থেকেই বিবাদমান দ্বন্দ্বের জেরে সোহানকে ওরা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। তবে সোহানের পিতা লোকমান হোসেন পুলিশের এই দাবিকে নাকচ করে পাল্টা অভিযোগে বলেন, “এখানে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে দফারফা হয়েছে বলেই ওদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোন এ্যাকশন নেয় নি।”

২০২০ সালের ৩জুলাই কুষ্টিয়া শহরের কুঠি পাড়ায় ফুটবল খেলা নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে তরিকুল ইসলাম নামের এক কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা।
২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার সময় শহরের এন এস রোডে অবস্থিত কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের সামনে এক হামলার ঘটনায় মজমপুরের হৃদয়(১৮) নামক এক কিশোর গুরুতর আহত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। কিশোর গ্যংয়ের মধ্যে বিবাদমান দ্বন্দ্বের জেরে এ ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর হাউজিং অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র লাবিব আসলামকে মারধর করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেয় অপর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর বাবার করা মামলায় অষ্টম ও নবম শ্রেনীতে পড়–য়া ৪কিশোরকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। কুষ্টিয়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক অরূপ কুমার গোস্বামী জামিন শুনানীকালে আদালতে উপস্থিত গ্রেফতার কিশোরদের পিতামাতা ও অভিভাবকদের ভৎস্মর্না করে ভবিষ্যতে সন্তানদের অনুশাসনে শতর্ক হওয়ার শর্তে গ্রেফতার কিশোরদের জামিনাদেশ দেন বলে নিশ্চিত করেন ঘটনার সময় কর্তব্যরত কোর্ট জিআরও উপ-পুলিশ পরিদর্শক নকিব উদ্দিন।

সমাজে কিশোর অপরাধ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কিত সচেতন নাগরিক সমাজ। সচেতন নাগরিক সমাজের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল আলম টুকু বলেন সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় কিশোর অপরাধ বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকহারে। হত্যা, চুরি ডাকাতি থেকে শুরু করে সব ধরনের অপকর্ম করে আসছে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এজন্য অভিভাবকরা অনেকাংশে দায়ি। কারন তাদের সন্তানদের সম্পর্কে তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকা, তাদের হাতে দাবী মোবাইল, মোটরসাইকেল তুলে দেয়ায় এরা এমন বেপরোয় হয়ে উঠেছে। কিশোর অপরাধ ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারী প্রয়োজন মনে করেন তিনি।

কুষ্টিয়ার সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী হাসান আলী জানান কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে জেলায় সংঘটিত অন্তত: ৪০টি শিশু-কিশোর অপরাধের ঘটনায় জড়িত শিশু-কিশোর কিশোরীদের নিয়ে কাজ করছি। কেন তারা এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, অভিভাবকরাইবা কতটুকু দায়িত্ব পালন করছেন বা তারা তাদের সন্তানদেরকে ঠিকঠাক দেখভাল কিংবা নজরদারীতে রাখছেন কীনা সেদিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মো: সোহেল রানা জানান কুষ্টিয়া থানায় নতুন যোগদান করেছি। শুনেছি কুষ্টিয়া শহর কিংবা তার আশপাশ এলাকায় বেশ কিছু কিশোর অপরাধী রয়েছে। তারা বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহর ও শহরতলীতে অন্তত পক্ষে প্রায় ৩০টির অধিক স্পটে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া, কমলাপুর, আলফামোড়, পূর্ব মজমপুর, সাদ্দাম বাজার, উপজেলা মোড়, মতিমিয়ার রেলগেট, চৌড়হাস মোড়, কাস্টম মোড়, জেলখানা মোড়, হাউজিং কদমতলা, নিশান মোড়, বজলুর মোড়, রাজারহাট মোড়, বারখাদা ত্রিমোহনী, মঙ্গলবাড়িয়া, কাটাইখনামোড়, আমলাপাড়া মোড়, ছয় রাস্তার মোড়, কলেজ মোড়, শহর ঘেঁষা হাটশ হরিপুরের বেশ কয়েকটি স্পট কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ স্থান। একেক এলাকায় ১৫জন করে সদস্য রয়েছে।
তবে এসকে সজিবের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া শহরে রয়েছে আড়াইশ সদস্য। শহরের প্রতিটি স্পটের সাথেই সজিবের যোগসূত্র রয়েছে।

দৌলতপুরে প্রান্তিক কৃষকের মাঝে প্রণোদনার বীজ ও সার বিতরন

কুষ্টিয়ায় কিশোর গ্যাং ভয়ঙ্কর

আপডেট সময় ০৭:০৭:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ডেইলী পোস্ট:
আশির দশকে কুষ্টিয়া তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের নাম ছিল চরমপন্থী সন্ত্রাসী ও সংগঠন। নানা নামে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য সংগঠন। শ্রেণি শত্রু খতমের নামে মানুষ খুন ছিল তাদের প্রধান কাজ। এসব কারনে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ছিলনা। রাতে ঘুমাতে পারতনা মানুষ। তবে নব্বই দশকের শেষের দিকে সেই আতঙ্ক অনেকটাই কেটে যায়। ২০০৪ সালের পর র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশী অভিযানে পতন ঘটে চরমপন্থী স¤্রাজ্যের। তবে কুষ্টিয়াবাসীর জন্য নতুন করে দু:সংবাদ কিশোর গ্যাংয়ের আত্মপ্রকাশ। ২০১৫ সালের পর থেকে কুষ্টিয়া শহরে ভদ্র সমাজের কতিপয় বখে যাওয়া কিশোর একত্রিত হয়ে নানা অপকর্মে জড়ালেও তার ভয়ানক পরিনতি দেখা যায় ২০২০ সালের পর। বিশেষ করে করোনাকাল থেকে আত্মপ্রকাশ এসব গ্যাং দ্বারা একাধিক চুরি ছিনতাই, মাদকাশক্ত, অপহরণসহ হত্যাকান্ডের মতো নানা অপরাধ সংঘঠিত হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ছোট ছোট দলে বিভক্ত এসব কিশোর গ্যাং একে অন্যের উপর হামলা পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটাতে থাকে। অভিযোগ আছে এসব কিশোর গ্যাংকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মদদ যোগান রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীরা।
নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলে এসব কিশোরদের নানা ভাবে দলে টানেন। মূলত যুব ও সিনিয়র ছাত্রনেতারা এই সব কিশোরদের তথাকথিত বড় ভাই। বার্থ ডেসহ বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানে এই সমস্ত বড় ভাইয়েরা এদের নানা অপকর্মে ব্যবহার করে অর্জিত টাকা দিয়ে মদদ যুগিয়ে থাকেন। বিনিময়ে নির্বোধ এসব কিশোররা বড় ভাইদের দল ভারী করে। আধিপত্য মাদকচক্রের সম্পৃক্ততায় হিরোইজম বোধে নিজেদের উপস্থাপন করতে গিয়ে কোমলমতি এসব শিশু শিক্ষার্থীরা পা বাড়াচ্ছে অন্ধকার অপরাধ জগতে। সাম্প্রতিক সময়ে শহরে বিভিন্ন এলকায় এসব সমবয়সীদের মধ্যে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনাও বেড়ে গেছে। সহজলভ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির নানা ডিভাইসে অ্যাপস ব্যবহার করে নিজেরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে ২০১৪ সালের পর কুষ্টিয়া শহরের আলফা মোড়ে অমি নামে এক কিশোরের হাত ধরে কিশোর অপরাধের যাত্রা শুরু। তাতে যুক্ত হন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কিশোর গ্যাং লিডার এসকে সজিব। গত শনিবার কুষ্টিয়ার হরিপুরের পদ্মার চর এলাকা থেকে মিলন হোসেন নামে যে যুবকের ৯টুকরো মরদেহ উদ্ধার করা হয় তাকে নির্মমভাহে হত্যা করে এই এসকে সজিব নামে যুবকের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ। তিনি বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের বহিস্কৃত নেতা। সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। ওই মামলায় প্রধান আসামী হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। বর্তমানে অমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও তিনি কিশোর অপরাধী ছিলেননা দাবী করে থাকতেন বরাবরই।
বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন মোড়ে ৩০টির অধিক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। আর এসব কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন সমাজের কতিপয় ভদ্রলোকের বখে যাওয়া সন্তান। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, চুরি ছিনতাই, জমি দখল, নারী দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ, টেন্ডারবাজি ইত্যাদী অপকর্মই তাদের প্রধান কাজ। তবে এসব অপকর্মের শেল্টারদাতা ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা। তাদের প্রয়োজনে এসব কিশোর গ্যাংদের ব্যবহার করা হয়। সভা সমাবেশ, মিছিল মিটিংয়ে দেখা যায় তাদের সরব উপস্থিতি।
কিশোর গ্যাংয়ের কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মকান্ড ও তথ্য তুলে ধরা হলো:
২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার বেলা সাড়ে বারোটার দিকে কুষ্টিয়া শহরতলীর হাটশ হরিপুর বাজারে কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত জখমে গুরুতর আহত হয় আকাশ ও ইমন নামের দুজন কিশোর। এঘটনায় তামিম ইকবাল জয় নামক এক কিশোরকে আটক করে পুলিশ। আকাশ শালদহ গ্রামের আকমলের ছেলে ও ইমন একই এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে।
গত ২০২১ সালের ১২ই নভেম্বর শুক্রবার বিকেল ৫ টার সময় শহরের থানাপাড়া এলাকার কুষ্টিয়া হাইস্কুল মাঠে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় রক্তাক্ত জখম হয় গ্যাং লিডার সজিব শেখ(২২)নামে এক যুবক। ঘটনার সময় প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং জিবি গ্রুপের হৃদয়সহ সংশ্লিষ্টরা তাকে ডেকে নিয়ে হামলা চালায় বলে কুষ্টিয়া মডেল থানায় দেয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়। আহত সজিব ছাত্র লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে নিশ্চিত করেন শহর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে।
২০২১ সালের ১৫নভেম্বর দুপুরে কুষ্টিয়য় শহরের সাদ্দাম বাজার এলাকার বাসিন্দা চালকল মালিক লোকমান হোসেনের ছেলে সোহানকে (২২)কে অপহরণ করে আটকে রাখে কুখ্যাত কিশোর গ্যাং লিডার সজিবের নেতৃত্বে। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানায় ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে সোহানের পিতার এমন অভিযোগের সূত্র ধরে মডেল থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে অপহৃত সোহানকে উদ্ধারসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করে পুলিশ। যদিও কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশের দাবি এটা অপহরণ নয়; পূর্ব থেকেই বিবাদমান দ্বন্দ্বের জেরে সোহানকে ওরা ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। তবে সোহানের পিতা লোকমান হোসেন পুলিশের এই দাবিকে নাকচ করে পাল্টা অভিযোগে বলেন, “এখানে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে দফারফা হয়েছে বলেই ওদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোন এ্যাকশন নেয় নি।”

২০২০ সালের ৩জুলাই কুষ্টিয়া শহরের কুঠি পাড়ায় ফুটবল খেলা নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে তরিকুল ইসলাম নামের এক কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা।
২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার সময় শহরের এন এস রোডে অবস্থিত কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের সামনে এক হামলার ঘটনায় মজমপুরের হৃদয়(১৮) নামক এক কিশোর গুরুতর আহত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। কিশোর গ্যংয়ের মধ্যে বিবাদমান দ্বন্দ্বের জেরে এ ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর হাউজিং অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র লাবিব আসলামকে মারধর করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেয় অপর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর বাবার করা মামলায় অষ্টম ও নবম শ্রেনীতে পড়–য়া ৪কিশোরকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। কুষ্টিয়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক অরূপ কুমার গোস্বামী জামিন শুনানীকালে আদালতে উপস্থিত গ্রেফতার কিশোরদের পিতামাতা ও অভিভাবকদের ভৎস্মর্না করে ভবিষ্যতে সন্তানদের অনুশাসনে শতর্ক হওয়ার শর্তে গ্রেফতার কিশোরদের জামিনাদেশ দেন বলে নিশ্চিত করেন ঘটনার সময় কর্তব্যরত কোর্ট জিআরও উপ-পুলিশ পরিদর্শক নকিব উদ্দিন।

সমাজে কিশোর অপরাধ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কিত সচেতন নাগরিক সমাজ। সচেতন নাগরিক সমাজের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল আলম টুকু বলেন সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় কিশোর অপরাধ বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকহারে। হত্যা, চুরি ডাকাতি থেকে শুরু করে সব ধরনের অপকর্ম করে আসছে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এজন্য অভিভাবকরা অনেকাংশে দায়ি। কারন তাদের সন্তানদের সম্পর্কে তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকা, তাদের হাতে দাবী মোবাইল, মোটরসাইকেল তুলে দেয়ায় এরা এমন বেপরোয় হয়ে উঠেছে। কিশোর অপরাধ ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারী প্রয়োজন মনে করেন তিনি।

কুষ্টিয়ার সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী হাসান আলী জানান কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে জেলায় সংঘটিত অন্তত: ৪০টি শিশু-কিশোর অপরাধের ঘটনায় জড়িত শিশু-কিশোর কিশোরীদের নিয়ে কাজ করছি। কেন তারা এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, অভিভাবকরাইবা কতটুকু দায়িত্ব পালন করছেন বা তারা তাদের সন্তানদেরকে ঠিকঠাক দেখভাল কিংবা নজরদারীতে রাখছেন কীনা সেদিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মো: সোহেল রানা জানান কুষ্টিয়া থানায় নতুন যোগদান করেছি। শুনেছি কুষ্টিয়া শহর কিংবা তার আশপাশ এলাকায় বেশ কিছু কিশোর অপরাধী রয়েছে। তারা বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহর ও শহরতলীতে অন্তত পক্ষে প্রায় ৩০টির অধিক স্পটে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া, কমলাপুর, আলফামোড়, পূর্ব মজমপুর, সাদ্দাম বাজার, উপজেলা মোড়, মতিমিয়ার রেলগেট, চৌড়হাস মোড়, কাস্টম মোড়, জেলখানা মোড়, হাউজিং কদমতলা, নিশান মোড়, বজলুর মোড়, রাজারহাট মোড়, বারখাদা ত্রিমোহনী, মঙ্গলবাড়িয়া, কাটাইখনামোড়, আমলাপাড়া মোড়, ছয় রাস্তার মোড়, কলেজ মোড়, শহর ঘেঁষা হাটশ হরিপুরের বেশ কয়েকটি স্পট কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ স্থান। একেক এলাকায় ১৫জন করে সদস্য রয়েছে।
তবে এসকে সজিবের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া শহরে রয়েছে আড়াইশ সদস্য। শহরের প্রতিটি স্পটের সাথেই সজিবের যোগসূত্র রয়েছে।