ঢাকা ০২:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ইরানের ভবিষ্যৎ কী ?

বিবিসির বিশ্লেষণ

ইব্রাহিম রাইসির মতো একজন রাষ্ট্রনায়ক ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হারানোর পর দেশটির ভবিষ্যৎ কী, তা-ই যেন এ মুহূর্তে সবার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর রাইসি একদিকে যেমন ইরানকে বেশ কঠোর হাতে সামলেছিলেন, ঠিক তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে বেশ শক্তিশালী প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেন। তার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসরায়েলে হামাসের হামলা, গাজায় ইতিহাসের বর্বরোচিত দীর্ঘমেয়াদি ইসরায়েলি অভিযান এবং ইসরায়েলে প্রথমবারের মতো কোনো ইরানি হামলার ঘটনা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তার অনুপস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ কী, তা বড় একটি প্রশ্ন।

ইরানে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করা। ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অধীনে ৫০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা বেশ কঠিন কাজ হবে সরকারের পক্ষে। কারণ, গত মার্চে পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছিল। দেড় বছর আগে পুলিশি হেফাজতে মাশা আমিনি নামে তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হিজাববিরোধ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে, যা অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করে সরকার। এর পর থেকে সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে ইরানের সাধারণ মানুষ। কাজেই আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উৎসবমুখরভাবে আয়োজন করা এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেমন নেতা আসছেন, সেদিকে সবার মনোযোগ থাকবে। আর যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, তিনি রাইসির মতো কঠোরভাবে হাল ধরতে পারবেন কি না, সেটাও দেখার বিষয়।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার চূড়ার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিলেন ইব্রাহিম রাইসি। ৮৫ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অনুপস্থিতিতে তাকেই ভাবা হচ্ছিল সেই স্থানটির জন্য। রাইসিকে গড়েও তোলা হয়েছে সেরকমভাবে। কিন্তু তার এ আকস্মিক মৃত্যু সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে। খামেনির আসনে বসার জন্য দেশটিকে সামনে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। এটি এখন আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির সামনে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদ সংস্থার ওয়েবসাইট আমওয়াজ ডট মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, ইব্রাহিম রাইসির পদমর্যাদারও সুস্পষ্ট কোনো উত্তরসূরি দেখা যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে খামেনির আসনে বসার মতো লোকও দেখা যাচ্ছে না। চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক ড. সানাম ভাকিল বলেন, খামেনির প্রতি আনুগত্য দেখাবেন এবং একই সঙ্গে রক্ষণশীল ঐক্য বজায় রাখতে পারবেন—এমন এক নেতৃত্ব এখন খোঁজ করা হবে, তবে সে কাজটা হবে বেশ কঠিন। অবশ্য তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্দি বিবিসিকে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক আশঙ্কাকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে, পশ্চিমাদের ভাষ্যমতে, ইরানের পতন হওয়ার এবং ভেঙে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবে এটি এখনও আছে এবং আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে, এটি আগামী বছরগুলোতেও থাকবে।’

বার্লিনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এসডব্লিউপির ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ইরানে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন শিবির রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আরও কট্টরপন্থি আর বাকিদের তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী বলে মনে করা হয়। নতুন সংসদে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার লড়াই শিগগির আরও বেশি জোরদার হয়ে উঠবে।

তার মতে, ইব্রাহিম রাইসির দায়িত্ব যে ব্যক্তিই গ্রহণ করুন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে একটি নিষিদ্ধ এজেন্ডা নেবেন। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শীর্ষ নেতার হাতে। এই অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সংরক্ষণ তাদের হাতে, যারা ক্রমবর্ধমানভাবে শক্তির প্রয়োগ করে। ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ নিয়ে মাসখানেক আগে ইসরায়েলের সঙ্গে নজিরবিহীন সংঘর্ষের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট কিন্তু সিদ্ধান্ত নেননি। কাজেই ভবিষ্যতে খামেনির আসনে কে আসবেন, তা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেটা নিয়ে ইরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ইরানের ওপর আগে থেকেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হিজাববিরোধী আন্দোলনের পর এসব নিষেধাজ্ঞা আরও বেড়েছে। রাইসির মতো কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নেতা প্রেসিডেন্ট না হলে আরও বিপদের আশঙ্কা করছেন দেশটির অনেক মানুষ। তাদের মতে, রাইসি বেশ কঠোর রাষ্ট্রনায়ক হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো ক্ষমতা ছিল তার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়, তা হচ্ছে রাইসি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিকে তোয়াক্কা না করে পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর সে কর্মসূচি চালু রাখতে পারেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে দেশটির জনগণের মাঝে।

ইরানের ভবিষ্যৎ কী ?

আপডেট সময় ১২:২৬:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ মে ২০২৪
বিবিসির বিশ্লেষণ

ইব্রাহিম রাইসির মতো একজন রাষ্ট্রনায়ক ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হারানোর পর দেশটির ভবিষ্যৎ কী, তা-ই যেন এ মুহূর্তে সবার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর রাইসি একদিকে যেমন ইরানকে বেশ কঠোর হাতে সামলেছিলেন, ঠিক তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে বেশ শক্তিশালী প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেন। তার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসরায়েলে হামাসের হামলা, গাজায় ইতিহাসের বর্বরোচিত দীর্ঘমেয়াদি ইসরায়েলি অভিযান এবং ইসরায়েলে প্রথমবারের মতো কোনো ইরানি হামলার ঘটনা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তার অনুপস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ কী, তা বড় একটি প্রশ্ন।

ইরানে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করা। ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অধীনে ৫০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা বেশ কঠিন কাজ হবে সরকারের পক্ষে। কারণ, গত মার্চে পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছিল। দেড় বছর আগে পুলিশি হেফাজতে মাশা আমিনি নামে তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হিজাববিরোধ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে, যা অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করে সরকার। এর পর থেকে সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে ইরানের সাধারণ মানুষ। কাজেই আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উৎসবমুখরভাবে আয়োজন করা এবং সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেমন নেতা আসছেন, সেদিকে সবার মনোযোগ থাকবে। আর যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন, তিনি রাইসির মতো কঠোরভাবে হাল ধরতে পারবেন কি না, সেটাও দেখার বিষয়।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার চূড়ার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিলেন ইব্রাহিম রাইসি। ৮৫ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অনুপস্থিতিতে তাকেই ভাবা হচ্ছিল সেই স্থানটির জন্য। রাইসিকে গড়েও তোলা হয়েছে সেরকমভাবে। কিন্তু তার এ আকস্মিক মৃত্যু সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে। খামেনির আসনে বসার জন্য দেশটিকে সামনে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। এটি এখন আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির সামনে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদ সংস্থার ওয়েবসাইট আমওয়াজ ডট মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, ইব্রাহিম রাইসির পদমর্যাদারও সুস্পষ্ট কোনো উত্তরসূরি দেখা যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে খামেনির আসনে বসার মতো লোকও দেখা যাচ্ছে না। চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক ড. সানাম ভাকিল বলেন, খামেনির প্রতি আনুগত্য দেখাবেন এবং একই সঙ্গে রক্ষণশীল ঐক্য বজায় রাখতে পারবেন—এমন এক নেতৃত্ব এখন খোঁজ করা হবে, তবে সে কাজটা হবে বেশ কঠিন। অবশ্য তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্দি বিবিসিকে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক আশঙ্কাকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে, পশ্চিমাদের ভাষ্যমতে, ইরানের পতন হওয়ার এবং ভেঙে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবে এটি এখনও আছে এবং আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে, এটি আগামী বছরগুলোতেও থাকবে।’

বার্লিনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এসডব্লিউপির ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ইরানে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন শিবির রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আরও কট্টরপন্থি আর বাকিদের তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী বলে মনে করা হয়। নতুন সংসদে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার লড়াই শিগগির আরও বেশি জোরদার হয়ে উঠবে।

তার মতে, ইব্রাহিম রাইসির দায়িত্ব যে ব্যক্তিই গ্রহণ করুন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে একটি নিষিদ্ধ এজেন্ডা নেবেন। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শীর্ষ নেতার হাতে। এই অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সংরক্ষণ তাদের হাতে, যারা ক্রমবর্ধমানভাবে শক্তির প্রয়োগ করে। ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ নিয়ে মাসখানেক আগে ইসরায়েলের সঙ্গে নজিরবিহীন সংঘর্ষের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট কিন্তু সিদ্ধান্ত নেননি। কাজেই ভবিষ্যতে খামেনির আসনে কে আসবেন, তা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেটা নিয়ে ইরানের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ইরানের ওপর আগে থেকেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হিজাববিরোধী আন্দোলনের পর এসব নিষেধাজ্ঞা আরও বেড়েছে। রাইসির মতো কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নেতা প্রেসিডেন্ট না হলে আরও বিপদের আশঙ্কা করছেন দেশটির অনেক মানুষ। তাদের মতে, রাইসি বেশ কঠোর রাষ্ট্রনায়ক হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো ক্ষমতা ছিল তার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়, তা হচ্ছে রাইসি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিকে তোয়াক্কা না করে পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর সে কর্মসূচি চালু রাখতে পারেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে দেশটির জনগণের মাঝে।